দামতুয়া ঝর্না

দামতুয়া-ঝর্না

দামতুয়া ঝর্না পরিচিতি

দুর্গম পাহাড়ের মাঝে এক ঝর্ণা, নাম দামতুয়া। অবস্থান বান্দরবান জেলার আলীকদম উপজেলায়। কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে এর সৌন্দর্য উপভোগ করতে হয় বলেই হয়তো ঝর্ণাটির রয়েছে বিশেষ কদর। পাথরের বুক বেয়ে নেমে আসা ঝর্ণার জলরাশি মুহূর্তেই প্রাণ সঞ্চার করে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে আসা ক্লান্ত পর্যটকদের মাঝে। স্থানটির স্নিগ্ধ প্রকৃতি মুগ্ধতার আবেশে জড়িয়ে নেয় সকলকে। এই অপরূপ সৌন্দর্যের কারণে অনেকেই দামতুয়া ঝর্ণাকে দেশের অন্যতম সুন্দর ঝর্ণা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। ঝর্ণাটি পর্যন্ত পৌঁছানোর পথটিও বেশ রোমাঞ্চকর।

যারা ট্রেকিং করতে পছন্দ করেন তাদের সবুজে ঘেরা ১২-১৩ কি. মি দীর্ঘ পাহাড়ি এই রাস্তা ভালো লাগতে বাধ্য। ট্রেকিং এর সময় উঁচু পাহাড় থেকে দৃষ্টিগোচর চারিদিকের দৃশ্য সত্যিই অপরূপ। এই যাত্রাপথেই চোখে পড়ে আদিবাসীদের গ্রাম, সেখানে তাদের জীবনযাত্রার চিত্র। তবে গন্তব্যের এই রাস্তাটি বেশ লম্বা এবং দুর্গম। তাই অবশ্যই সক্ষমতা বিবেচনা করে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।

দামতুয়া জলপ্রপাতের নামকরণ

দামতুয়া ঝর্ণাটি বেশ কিছু নামে পরিচিত। যার মধ্যে ডামতুয়া, লামোনই, ওয়াজ্ঞাপারাগ এবং তুক অ উল্লেখযোগ্য। এসব নামের রয়েছে নিজস্ব অর্থবাচকতা। ডামতুয়া অর্থ খাড়া দেয়াল বা প্রাচীর। লামোনই অর্থ চাঁদের আলো, যা মূলত চাঁদের আলোয় সৃষ্ট ঝর্ণাটির ভিন্নধর্মী সৌন্দর্যকে নির্দেশ করে। ওয়াজ্ঞাপারাগ বলতে উঁচু স্থান থেকে প্রবাহিত পানিকে বোঝায়। অন্যদিকে স্থানীয় মুরং ভাষায় তুক অ এর অর্থ হলো ব্যাঙ ঝিরি।

দামতুয়া ঝর্ণা কোথায় অবস্থিত? 

দামতুয়া ঝর্ণাটির অবস্থান বান্দরবান জেলার আলীকদম উপজেলার মুরং নামক এলাকায়।

যাওয়ার উপযুক্ত সময়

যে কোন ঝর্ণার মত দামতুয়া ঝর্ণারও আসল রূপ ফুটে ওঠে বর্ষাকালে। কারণ বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় এ সময় পানির প্রবাহ বেশি হয়ে থাকে। তাই বর্ষা বা বর্ষা পরবর্তী সময় অর্থাৎ জুলাই থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত এখানে আসার উপযুক্ত সময়। তবে অতিবৃষ্টি হলে ঝর্ণা পর্যন্ত যাওয়ার রাস্তাটি বিপজ্জনক হয়ে ওঠায় অনেক সময় সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে সেখানে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয় না। যাওয়াটা নিরাপদও নয়। তাই আবহাওয়ার কথা বিবেচনা করে তবেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

যাওয়ার উপায়

ঢাকা থেকে সরাসরি আলীকদম

ঢাকা থেকে সরাসরি বান্দরবান জেলার আলিকদম উপজেলায় যাবার জন্য বেশকিছু বাস সার্ভিস রয়েছে। সাধারণত ঢাকার গাবতলী, সায়দাবাদ ও কল্যাণপুর থেকে শ্যামলী পরিবহন ও হানিফ এন্টারপ্রাইজের চলাচল বেশি দেখা যায়। সন্ধ্যা ৭ টা থেকে রাত ১১ টা অবধি গাড়িগুলো ঢাকা থেকে রওনা করে। বাসে বা ট্রেনে করে প্রথমে চিটাগাং শহরে যেতে হবে প্রথমে, তারপর সেখান থেকে বান্দরবান, বান্দরবান থেকে আলিকদম। যারা ট্রেনে যাতায়াত করতে বেশি পছন্দ করেন তাদের জন্য এই রুট-টা উপযুক্ত রুট হতে পারে। এমন পথে মোট সময় লাগবে ১০ থেকে ১২ ঘন্টা।

আর একটি জনপ্রিয় রুট। ঢাকা থেকে  বান্দরবান শহর হয়ে আলিকদমের দূরত্ব প্রায় ৩৯০-৪০০  কি. মি. এবং বাস পথে যানজট না থাকলে সময় লাগে ১০-১২ ঘন্টা। সবঠিক থাকলে এক ঘুমে আলীকদম পৌঁছাবেন সকালে ৮-৯ টার মধ্যে। এই রুটে চলাচলকারী বাসগুলোর ভাড়া নিম্নরুপঃ 

  •  শ্যামলি পরিবহণে ননএসিতে ভাড়া পরবে জনপ্রতি ৮৫০ টাকা 
  • হানিফ এন্টারপ্রাইজেও ননএসিতে ভাড়া পরবে জনপ্রতি ৮৫০ টাকা 
  • আর এসিবাসের কোম্পানি ভেদে ভাড়া জনপ্রতি পরবে ৯০০-১৭০০ টাকা।

আলীকদম থেকে দামতুয়া ঝর্ণা

পৌঁছে গেলেন আলীকদম, এরপর? এবার আপনাকে চলে যেতে হবে আলীকদমের পানবাজারে। সেখান থেকে রওয়ানা দিতে হবে “১৭ কিলোমিটার” পয়েন্টের আদু পাড়ার উদ্দেশ্যে।

আলীকদম এর পানবাজার থেকে আদু পাড়া বা দামতুয়া পারা পর্যন্ত যাবার জন্য মোটরসাইকেল ভাড়া পেয়ে যাবেন, ফিরতি যাত্রাও হবে সেই একই মোটরসাইকেলে । একটি মোটরসাইকেলে দুইজন যেতে পারবেন, দুইজনের আসা-যাওয়া মিলিয়ে ভাড়া বাইকে গুনতে হবে ৪০০ – ৬০০ টাকা । গ্রুপ নিয়ে গেলে চান্দের গাড়ি ভাড়া করেও যেতে পারেন সেখানে ১২/১৩ জনের টিম যাওয়া আসা মিলিয়ে ১৫০০ থেকে ২৫০০ টাকা লাগবে । রিজার্ভ করার ক্ষেত্রে দামাদামি করে নিতে হবে।

এই ‘১৭ কিলোমিটার’ -এর  আদু পাড়া যাওয়ার পথে রয়েছে সেনাবাহিনীর ক্যাম্প, সেখানে আপনাকে ফোন নম্বর এবং জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে সামনে অগ্রসর হওয়ার অনুমতি গ্রহণ করতে হবে। এর পর আপনাকে ৬ কি. মি পাহাড়ি পথ ট্রেকিং করতে হবে। ট্রেকিং শেষে বিকাল ৫টার মধ্যে এই ক্যাম্পে ফিরে হাজিরা জানাতে হয়। পর্যটকদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই এই নিয়ম করা হয়েছে। তাই সময়ের দিকে লক্ষ্য রাখার অনুরোধ রইলো।

মূলত এই আদু পাড়া থেকেই শুরু হবে রোমাঞ্চকর ট্রেকিং। দামতুয়া ঝর্ণা পর্যন্ত যেতে আপনাকে সাথে বাধ্যতামূলক একজন গাইড নিতে হবে। গাইডের ফি হিসাবে প্রদান করতে হবে ৮০০ – ১০০০ টাকা। গাইড হিসেবে নেইদু দাকে – ০১৫৫৭৩৯৮৬৩৫ এ ফোন করতে পারেন। আদু পাড়া থেকে দামতুয়া ঝর্ণা ঘুরে আসতে সাধারণত ৬ ঘণ্টার কাছাকাছি সময়ের প্রয়োজন পড়ে। আসা-যাওয়া মিলিয়ে প্রায় ১২-১৩ কিলোমিটারের পাহাড়ি এই রাস্তা।

ফেরত আসার সময় এই রাস্তার মাঝে একটা জায়গা পরে, নাম মেম্বার পাড়া। এই পাড়া পেরিয়ে হাতের ডান পাশ দুয়ে একটা চিকন রাস্তা পাহাড়ের নিচে নেমে গেছে। আর এই রাস্তা ধরেই বোনাস হিসাবে দেখা পাবেন তুক অ ঝিরি ও ওয়াংপা। এই ঝর্ণার মত আরও কিছু সুন্দর জলপ্রোপাতের দেখা পেয়ে যেতে পারেন। তবে কি কি দেখতে চান গাইডের সাথে সে বিষয়ে আগে থেকেই আলোচনা করে নেওয়া ভালো।

কোথায় থাকবেন

দামতুয়া ঝর্ণার সন্নিকটে রাত্রিযাপনের তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। কারণ সেনাবাহিনী সাধারণত আশেপাশের গ্রামগুলোতে ক্যাম্পিং এর অনুমতি প্রদান করে না। তাই থাকার জন্য কমপক্ষে আলীকদম পর্যন্ত ফিরতে

হবে। সেখানে সাধারণ মানের কিছু আবাসিক হোটেল পেয়ে যাবেন। নিচে আপনাদের সুবিধার্থে হোটেলের নম্বর এবং ঠিকানা দেওয়া হলো

দ্য দামতুয়া ইন

আলীকদম উপজেলা রোড, আলীকদম

ফোনঃ +৮৮ ০১৭৪৮-৯১২১২৭

এছাড়া, আলীকদম গেস্ট হাউস, হোটেল আলীকদম ও ‘জেলা পরিষদের ডাক বাংলো’-তে থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। হোটেলের কক্ষগুলোর ভাড়া ৬০০ – ২০০০ টাকা প্রতি রাতের জন্য। অথবা আপনি চলে যেতে পারেন ‘শৈলকুঠির রিসের্টটে’ – যোগাযোগে – ০১৮২০৪০৩৩৫৫ – নম্বারে ফোন করতে পারেন।

কোথায় খাবেন

আলীকদমের পানবাজারে খাবার কয়েকটি হোটেল আছে। বাকি পথে তেমন কোনো হোটেল না থাকায় সেখান থেকেই খাবারদাবার সেরে নিতে হবে। দুপুরের খাবার হিসেবে সাথে শুকনো খাবার এবং পানি নিয়ে যেতে হবে। পাশাপাশি খাবার স্যালাইনও সাথে রাখা ভালো। এছাড়া আদুপাড়ায় টং দোকান থেকে হাল্কা কিছু খাবার যেমন বিস্কুট, কেক, চানাচুর, চিপস, ঠান্ডা পানি গ্রহণ করতে পারবেন।

দামতুয়া ভ্রমণ খরচ

সাধারণত ভ্রমণ খরচ নানা বিষয় দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকে। তাই সবার ক্ষেত্রে একই খরচ বা বাজেট প্রযোজ্য নয়। তবুও আপনাদের ধারণা নেওয়ার জন্য নিম্নে জনপ্রতি খরচ সংক্রান্ত তথ্য প্রদান করা হলো –

খরচের ধরন (এক জনের)   পরিমাণ (টাকায়)
বাস ভাড়া যাওয়া – আসা (ননএসি) ১৭০০/-
বাইক বা মোটর ভাড়া যাওয়া – আসা ৬০০/-
গাইড ফি  ১০০০/-
খাবার শুকনো + ভাড়ি  ৪০০/-
মোট খরচ ৩৭০০/-

বি. দ্র : যদি হোটেলে রাত্রিযাপণ করা হয় তাহলে খরচ আরও বাড়বে ৬০০ – ৮০০ টাকা। এবং সেটি মোট খরচের সঙ্গে যোগ করে দেন ।  তবে সময় বা পরিস্থিতির উপর এই খরচ কম বেশি হতে পারে। তাই আগে থেকেই খরচ সংক্রান্ত আপডেট খবরগুলো জেনে নিলে বিপদ হবে না। তবে গ্রুপ নিয়ে গেলে জনপ্রতি খরচ অনেকটাই হ্রাস পায়।

ট্রেকিং পরামর্শ :  

১. ট্রেকিং – এর জন্য ভালো মানের জুতা।

২. শুকনো খাবার ও পানির বোতল সঙ্গে রাখবেন।

৩. ওয়াটারপ্রুফ ব্যাগে ফার্স্ট এইড কিড, এনআইডি কার্ড, পাওয়ার ব্যাংক ও কিছু প্রয়োজনীয় জিনস রাখুন। 

৪. সাঁতার না জানলে ঝর্ণায় গোসল করা থেকে বিরত থাকতে হবে। প্রয়োজনে লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার করুন। 

৫. শিশু ও বৃদ্ধ মানুষদের পারতপক্ষে ট্রেকিং না করা ভালো।

৬. একা ট্রেকিং না করে বরং কয়েকজনে মিলে করা উত্তম এবং সঙ্গে ট্রেকিং স্টিক রাখুন। 

৭. অজানা পথ বা পাহাড়ি গুহায় হঠাৎ প্রবেশ করা থেকে বিরত থাকুন। 

৮. স্থানীয় উপজাতিদের বা কোনো সম্পদ নষ্ট না করবেন না। 

৯. ট্রেকিং – এর আগে ওয়েদার আপডেট জেনে নেওয়া ভালো। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!