নৈস্বর্গিক সৌন্দর্যের দেবতাখুম

দেবতাখুম

দেবতাখুম

বান্দরবান জেলার রোয়াংছড়ির রেমাক্রিতে অবস্থিত দুপাশে বুক উঁচু করে দাড়ানো পাহাড়ের দেয়াল, মাঝ দিয়ে চলা স্বচ্ছ নীলাভ পানির জলধারা আর ঝর্ণার নৈসর্গিক মিলনের এক অপার ভূমি দেবতাখুম। দেবতাখুম শব্দের অর্থ দেবতাদের জলাধার। হ্যাঁ ঠিক তাই আর এজন্যই হয়তো বান্দরবানে ছড়িয়ে থাকা অনেক খুমের মধ্যে ৫০-৮০ ফুট গভীরতার প্রায় ৬০০ ফুট দৈর্ঘ্যের এই খুমটিই এতো বিখ্যাত।

ভ্রমণের উপযুক্ত সময়

সাধারণত বর্ষা পরবর্তী সময়টায় এখানে ঘোরার জন্য সবচেয়ে ভালো সময়। অর্থাৎ নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি এসময় খুমে পরিপূর্ণ  পানি, শুকনো রাস্তা, হিল ট্রেকিং,  সবুজ প্রাকৃতি আর আলোর খেলা, ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য হবে সবচেয়ে উপভোগ্য। তবে গ্রীষ্ম ও বর্ষায় এখানে ভ্রমণ করাটা হতেপারে একটু অস্বস্তিকর  কারণ এসময় গরম, ঝড়, বন্যা আর পিচ্ছিল রাস্তা হওয়ায় হিল ট্রেকিং,  বোট রাইড বা গোসলের ক্ষেত্রে সমস্যায় পরতে হতে পারে।

কীভাবে যাবেন ?

ঢাকা থেকে দেবতাখুম যেতে বাসপথই সবচেয়ে সুবিধার কারণ সরসরি বান্দরবান কোনো ট্রেন যায় না । সেক্ষেত্রে ঢাকার গাবতলি বা সায়দাবাদ থেকে সরাসরি রাঙমাটিগামী বাসে উঠতে হবে। তবে লং রুটের এই বাসগুলো বেশিরভাগ রাতে ছাড়ে। সাধারণত এসি ও ননএসি উভয় বাসই পাবেন। ননএসির মধ্যে ইউনিক পরিবহণ ছাড়ে সন্ধ্যা ৬:৩০ টায় , হানিফ সন্ধ্যা ৭:৩০ টায়, সেন্ট মার্টিন পরিবহণ রাত ৮:৪৫ টায়, শ্যামলী রাত ৯:৩০ টায় , সাউদিয়া পরিবহণ রাত ১০:৪৫ টায় , দেশ ট্রাভেলস রাত ১১:০০ টায় আর ভাড়া এন্টারপ্রাইজ ভেদে ৬২০ -৭০০ টাকা পরবে তবে শ্যামলি, গ্রিনলাইন, দেশ ট্রাভেলস, হানিফের মতো এসি বাসগুলোতে ১২০০-১৫০০ টাকা ভাড়া পরবে । প্রায় ৩৫০ কিমি রাস্তা পারি দিয়ে বান্দরবান শহরে পৌঁছাতে সময় লাগবে ৮/৯ ঘন্টা। এরপর বান্দরবন নেমে লোকাল বাস বা চাঁদের গাড়ি ধরে ১ ঘন্টার রাস্তা পার দিয়ে রোয়াংছড়ি যেতে হবে। লোকাল বাসে ৫০-৬০টাকা মাথা প্রতি লাগলেও রিজার্ভ চাঁদেরগাড়ি ১২০০-১৫০০ টাকা পরবে। রোয়াংছড়ি নেমে প্রধান কাজ হল, উপজেলা  গেট/চেকপোস্টে গিয়ে নিতে  হবে ৫০ টাকা খরচে দেবতাখুম ভ্রমণের পারমিশন সেক্ষেত্র আপনার এনআইডির একটি ফটোকপি রাখতে হবে এবং বাধ্যতামূল গাইড নিতে হবে। একদিনের জন্য ৩৫০-৫০০ টাকায় একটা গাইড পেয়ে যাবেন। এরপর রোয়াংছড়ি থেকে শিলাবাঁধ/আমতলি পর্যন্ত নিতে হবে ৩০-৪০ মিনিটের  বাইক রাইড কারণ পাহাড়ি এই পথে আর কোনো বাহন পাবেন না। শিলাবাঁধ নেমে অল্প কয় মিনিট হেঁটে ধরতে হবে নৌকা তারপর জনপ্রতি আসা-যাওয়া ৩০০-৪০০ টাকার নৌকায় মাত্র ১৫-২০ মিনিটের মধ্যেই প্রবেশ করবেন মনোহর প্রকৃতি ঘেরা দেবতাখুমে।

তবে ট্রেনে যেতে চাইলে সোনার বাংলা এক্সপ্রেস চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে ছাড়ে সকাল ৭ টায়, মহানগর প্রভাতী সকাল ৭:৪৫ টায়, সুবর্ণা এক্সপ্রেস বিকেল ৪:৩০ টায় সেক্ষেত্রে সময় লাগবে ৫-৬ ঘন্টা এবং সুভনে মাথাপ্রতি ভাড়া পরবে ২৮০-৩৫০ আর ফার্স্ট ক্লাস ৫২০-৬২০ টাকা। এরপর চট্রগ্রাম রেলস্টেশন বা বদ্দারহাট থেকে পূর্বানী, পূবালী, পূরবী পরিবহণে জনপ্রতি ১৮০-২২০ টাকা ভাড়ায় ২-৩ ঘন্টায়  পৌঁছাতে পারবেন  বান্দরবান শহরে তারপর বাসের রুটকে ফলো করলেই চলবে।

খাবেন যেখানে ? 

খাবারের জন্য দেবতাখুম মেইন পয়েন্টে কোনো হোটেল বা রেস্টুরেন্টে  পাবেন না। তাই আপনি একটু এগিয়ে আমতলী বা বামবাঁধ এলাকায় গেলে কিছু ছোটো টং দোকান পাবেন যেখানে ডিম, পরোটা, বিস্কুট,  কেক, চা এর মতো হালকা নাস্তা পাবেন যা ৫০-৮০ টাকার মধ্যেই হবে। তবে দুপুরে ভাত খেতে চাইলে পাশে মুড়ং/বম পাড়ায় স্থানীয়দের পূর্বেই অর্ডার দিতে হবে তাহলে ১/২ ঘন্টার মধ্যে তারা রান্না করে দেয়। চাহিদা মতো ভাত, মুরগী, মাছ, ডিম ও স্থানীয় যে কোনো আইটেম অর্ডার করতে পারবেন।  মূল্য খবার ভেদে ১২০-২৫০ টাকা পরতে পারে। তবে নৌকায় বেশি সময় ঘোরার ইচ্ছে থাকলে পূর্বেই সঙ্গে  পানি ও শুকনো খাবার নিয়ে নিন। আবার ট্রকিংয়ের সময় রিজুক ঝর্ণ বা বোগা লেক এলাকাতেও কিছু স্থানীয় দোকানে নাস্তাসহ ভাতের আইটেম পেয়ে যাবেন। আর যারা একটু আরও ভালো মানের খাবার শান তাঁরা বান্দরবান শহরে ফুড ভিলেজ, হিল ভিউ, সুলতান, নীলগিরি ও গ্রিন প্রেরির মতো নামকরা রেস্টুরেন্টে বাঙালি ও বিদেশি বিভিন্ন আইটেমের খাবার পাবেন।

থাকবেন কোথায় ?

মূলত দেবতাখুম প্রাকৃতিক ঝিড়ি ও পাহাড় ঘেরা স্থান হওয়ায় এখানে রাতে থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই। রাতে থাকবার জন্য তাই আপনাকে যেতে হবে থানচি অথবা বান্দরবান মূল শহরে। থানচি-নাফাখুম রুটে থানচি বাসস্ট্যান্ড মুক্তমঞ্চের পিছনে  গেলেই পাবেন সেগুন ঝিড়ি গেস্ট হাউজ – যোগাযোগ ০১৮১৮০৯৪৪৪২ / ০১৮৪৪৮৮৬৬০৬, থানচি বিজিবি চেকপোস্ট সংলগ্ন তাজিংডং রিসোর্ট – যোগাযোগ ০১৬০৯৫১৪১৮৬ / ০১৮৬৪৪২৯৭৯১, হাইল্যান্ডার পার্ক এন্ড রিসোর্ট – যোগাযোগ – 01618-193666। তাছাড়াও আশপাশে স্থানীয় উপজাতিদের বাসায় হোমস্টে করতে পারেন।  আর একটু বেশি সুযোগ-সুবিধা চাইলে বান্দরবান শহরে হোটেল থ্রি স্টার – যোগাযোগ – ০৩৬১-৬৩৫৬৬ / ০১৭৩৭৪৪৫৭৬৬, নদী-পাহড় সংলগ্ন হোটেল রিভার ভিউ – যোগাযোগ -০৩৬১-৬২৭০৭। এই হোটেলগুলোতে মানভেদে ৫০০-২৫০০ টাকা মাথাপ্রতি বেশ আরামদায়ক পরিবেশে পরিবারসহ বা বন্ধুসহ থাকা যাবে।

ভ্রমণে বিশেষ সতর্কতা 

যেহেতু দেবতাখুম একটি সংরক্ষিত পাহাড়ি ও ঝিড়ি এলাকা তাই এখানে ভ্রমণে বেশকিছু বিষয় খেয়াল রাখা উচিৎ। 

  • পাহাড়ি এলাকায় ট্রেনিংয়ের জন্য শক্ত বিট যুক্ত জুতো পরা ও সঙ্গে স্টিক/বাঁশের লাঠি নেওয়া।
  • বোতলাজাত পানি, শুকনো খাবার, স্যালাইন সঙ্গে রাখা।
  • ভ্রমণের সময় সকাল থেকে দুপুরের মধ্যেই শেষ করা যাতে নিরাপদে পাহাড়ি রাস্তা ধরে ফিরা যায়।
  • স্থানূয় রেপুটেড গাইড সঙ্গে নিবেন কিন্তু অচেনা গাইড থেকে বিরত থাকবেন।
  • আর্মি ক্যাম্পে রিপোর্টের জন্য সঙ্গে এনআইডি/ভোটার আইডি রাখুন।
  • আপনার ব্যবহৃত প্লাস্টিক বোতল, প্যাকেট বা অন্যান্য আবর্জনা অবশ্যই নির্দিষ্ট স্থানে ফেলবেন।
  • যাত্রার পূর্বে কোথায় ঘুরবেন, কোথায় খাবেন, কোথায় থাকবেন এগুলো সাজিয়ে নেওয়া।
  • যেহেতু পাহাড়ি এলাকায় ঠিকমতো নেটওয়ার্ক থাকে না তাই কয়েকজনের ছোট দলে ঘোরাফেরা করবেন।
  • সাঁতার না জানলে ঝিড়িতে নামবেন না। নৌকা ভ্রমণে লাইফ জ্যাকেট পরে নিবেন। সন্ধ্যার আগে ভ্রমণ শেষ করুন।

ছবিঃ জয়দীপ চৌধুরী আকাশ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!