। সর্বশেষ আপডেট: সেপ্টেম্বর ২০২৬
সিলেট জেলায় অবস্থিত রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট ভ্রমণপিয়াসুদের অন্যতম পছন্দের এক জায়গার নাম। তার পেছনের কারণটাও বেশ স্পষ্ট, রাতারগুলের নিজস্ব ভিন্নধর্মী সৌন্দর্য উপভোগের জন্য এখানে আসার বিকল্প নেই। চারদিকে পানি এবং সবুজের সমারোহ প্রশান্তির এক আবেশে জড়িয়ে নেয় স্থানটিতে ঘুরতে আসা পর্যটকদের। পানিতে অর্ধ নিমজ্জিত গাছগুলোর চতুর্দিকে ছড়িয়ে থাকা ডালপালার ফাঁকফোকর দিয়ে কখনো বেরিয়ে আসে সূর্যের রশ্মি আবার কখনো বা ঝড়ে পড়ে বর্ষার জল। এসব গাছ দেখলে মনে হয় সোজা পানির বুক থেকে উঠে এসেছে এর শাখা-প্রশাখা। নানা সময়ে গাছগুলোতে দেখা মেলে বিভিন্ন প্রজাতির পাখির। এখানের ওয়াচ টাওয়ার থেকে দৃষ্টিগোচর হয় মনোমুগ্ধকর এক দৃশ্য। নৌকায় বসে পানিতে বৈঠার সৃষ্ট শ্রুতিমধুর শব্দ শুনলে মনের মাঝে তৈরি হয় ভিন্নরকম এক ভালোলাগার।
এক নজরে রাতারগুল
| তথ্য | বিবরণ |
|---|---|
| অবস্থান | ফতেহপুর ইউনিয়ন, গোয়াইনঘাট, সিলেট |
| জেলা | সিলেট |
| ধরন | মিঠাপানির জলাবন |
| সিলেট শহর থেকে দূরত্ব | প্রায় ২৩–২৬ কিলোমিটার |
| প্রধান আকর্ষণ | নৌকায় জলাবন ভ্রমণ |
| জনপ্রিয় ভ্রমণ সময় | বর্ষাকাল |
| মোট আয়তন | প্রায় ৩,৩২৫.৬১ একর |
| বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য | ৫০৪ একর |
রাতারগুল পরিচিতি
রাতারগুল সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নে অবস্থিত একটি মিঠাপানির জলাবন। বনটির মোট আয়তন প্রায় ৩,৩২৫.৬১ একর। এর মধ্যে ৫০৪ একর এলাকা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষিত। পর্যটনবিষয়ক বিভিন্ন লেখা ও প্রচারে রাতারগুলকে ‘সিলেটের সুন্দরবন’ এবং ‘বাংলার আমাজন’ নামেও উল্লেখ করা হয়।। এই বনের আয়তন ৩,৩২৫ একরের কাছাকাছি। এখানকার বনাঞ্চলের ৫০৪ একর জায়গাজুড়ে রয়েছে বন্যপ্রাণীদের অভয়ারণ্য। বর্ষার সময় এখানে পাবদা, টেংরা, রিটা সহ বিভিন্ন মাছ পাওয়া যায়। বছরে ৪ থেকে ৫ মাস এই বন পানিতে তলিয়ে থাকে। রাতারগুলের বনাঞ্চলজুড়ে রয়েছে হিজল, বেত, কদম সহ প্রায় ২৫ প্রজাতির গাছপালা, যার সবগুলোই জলসহিষ্ণু। যতদূর জানা যায় সিলেটের স্থানীয় ভাষায় রাতা নামক এক গাছের নাম থেকেই এই বনের নামকরণ।
রাতারগুল কোথায় অবস্থিত?
রাতারগুল সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নে অবস্থিত। সিলেট শহর থেকে রাস্তা ও যাত্রাপথ অনুযায়ী এর দূরত্ব প্রায় ২৩–২৬ কিলোমিটার।
রাতারগুল যাওয়ার উপায়
রাতারগুল যেতে চাইলে সর্বপ্রথম পৌঁছাতে হবে সিলেট জেলায়। তারপর সেখান থেকে চূড়ান্ত গন্তব্য রাতারগুলের উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে হবে।
ঢাকা থেকে সিলেট
সড়কপথঃ
ঢাকা থেকে সিলেট বাসে যেতে সাধারণত ৬–৭ ঘণ্টা সময় লাগে। বাসের ধরন, অপারেটর ও যাত্রার সময় অনুযায়ী ভাড়া পরিবর্তিত হয়। তাই টিকিট কাটার আগে সংশ্লিষ্ট পরিবহন কোম্পানির সর্বশেষ ভাড়া ও বাস ছাড়ার স্থান জেনে নেওয়া ভালো।
যোগাযোগ
১৬৫৫৭ (গ্রীন লাইন)
০১৯৪৪-৮০০২০০ (এনা)
রেলপথঃ
পারাবত, জয়ন্তিকা, কালনী এবং উপবন এক্সপ্রেস নামক ট্রেনগুলো সপ্তাহের বিভিন্ন দিনে ঢাকার কমলাপুর থেকে সিলেটের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। ঢাকা থেকে পারাবত এক্সপ্রেস মঙ্গলবার, উপবন এক্সপ্রেস বুধবার এবং কালনী এক্সপ্রেস শুক্রবার ব্যতীত সপ্তাহের ৬ দিন চলাচল করে।
অন্যদিকে জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস প্রতিদিনই চলাচল করে থাকে। পারাবত এক্সপ্রেস সকাল ৬টা ২০ মিনিট, উপবন এক্সপ্রেস রাত ৮টা ৩০ মিনিট, কালনী এক্সপ্রেস দুপুর ৩টা এবং জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস সকাল ১১টা ১৫ মিনিটে ঢাকা থেকে ছেড়ে যায়। ভাড়া ৩০০ থেকে ১০০০ টাকার মধ্যে। বাজেট ট্যুরের ক্ষেত্রে ট্রেনের সুলভ শ্রেণী যাত্রার ভালো একটি মাধ্যম। একদিনের সিলেট ভ্রমণের ক্ষেত্রে রাতের উপবন এক্সপ্রেসে যাত্রা করা তুলনামূলক সুবিধাজনক।
* ট্রেনের সময়সূচি ও সাপ্তাহিক বন্ধের দিন পরিবর্তিত হতে পারে। তাই টিকিট কাটার আগে বাংলাদেশ রেলওয়ের সর্বশেষ সময়সূচি দেখে নেওয়া উচিত।
যোগাযোগ
০০৮৮-০২-৯৩৫৮৬৩৪ (কমলাপুর রেল স্টেশন)
আকাশঃ
ঢাকা থেকে সিলেট সরাসরি বিমানে যাওয়া যায়। বিভিন্ন এয়ারলাইন এই রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করে। টিকিটের ভাড়া তারিখ, সময় ও বুকিংয়ের সময় অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়। তাই ভ্রমণের আগে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনের সর্বশেষ ভাড়া দেখে নেওয়া ভালো।
যোগাযোগ
১৩৬০৩ (নভোএয়ার)
০১৯৯০৯৯৭৯৯৭ (বিমান বাংলাদেশ)
সিলেট থেকে রাতারগুল
সিলেট শহর থেকে CNG, প্রাইভেট গাড়ি বা রিজার্ভ গাড়িতে রাতারগুলের বিভিন্ন ঘাটে যাওয়া যায়। এরপর ঘাট থেকে নৌকায় করে জলাবনের ভেতরে যেতে হয়। কোন ঘাট ব্যবহার করছেন, কতজন যাত্রী এবং নৌকার ধরন অনুযায়ী ভাড়া পরিবর্তিত হতে পারে। তাই নৌকা বা স্থানীয় যানবাহন নেওয়ার আগে ভাড়া নিশ্চিত করে নেওয়া ভালো।
রুট ১: আম্বরখানা → গোয়াইনঘাট → রাতারগুল
রুট ২: আম্বরখানা → মোটরঘাট → নৌকায় রাতারগুল
রুট ৩: সিলেট → সারীঘাট → গোয়াইনঘাট → রাতারগুল
একদিনের ভ্রমণ পরিকল্পনা
রাতারগুল ঘুরে দেখার জন্য কয়েক ঘণ্টাই যথেষ্ট। তাই ডে ট্যুরে রাতারগুল ভ্রমণে গেলে এর পাশাপাশি ভোলাগঞ্জ সাদাপাথরও সহজেই ঘুরে দেখা সম্ভব। সেক্ষেত্রে সিলেট শহর থেকে সকালের নাস্তা শেষ করে সাদাপাথর এবং সেখান থেকে রাতারগুল গিয়ে সন্ধ্যার মধ্যে আবার সিলেট শহরে ফিরে আসতে হবে। যাওয়ার পথে মালনীছড়া চা বাগানেও অনেকে ঢু মেরে আসেন। স্পটগুলোয় যেতে সারাদিনের জন্য সিএনজি রিজার্ভ করতে খরচ হবে ১২০০-১৫০০ টাকা এবং লেগুনা রিজার্ভ করতে গুণতে হবে ২২০০-২৫০০ টাকা। একা ভ্রমণে গেলে বাস এবং ইজি বাইকে করে ভেঙে ভেঙে এই পথ পাড়ি দিতে হবে।
রাতারগুল যাওয়ার উপযুক্ত সময়
রাতারগুলের জলাবনের স্বাভাবিক সৌন্দর্য দেখতে বর্ষাকাল সবচেয়ে জনপ্রিয় সময়। এ সময় বনের ভেতরে পানি বেড়ে যাওয়ায় পানিতে অর্ধনিমজ্জিত গাছপালার মধ্য দিয়ে নৌকায় ঘোরার অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়। সাধারণত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর/অক্টোবর পর্যন্ত সময়টি জনপ্রিয় হলেও পানির উচ্চতা বছর ও আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হতে পারে।
রাতারগুলে প্রবেশ ফি ও অন্যান্য খরচ
সরকার ২০২০ সালে রাতারগুল বিশেষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকায় প্রবেশ, নৌকা, filming ও পার্কিংয়ের জন্য বিভিন্ন ফি নির্ধারণ করেছিল। তবে মাঠপর্যায়ে বর্তমানে আদায়কৃত ফি পরিবর্তিত বা ভিন্ন হতে পারে। তাই ভ্রমণের আগে সংশ্লিষ্ট বন বিভাগ/স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সর্বশেষ ফি জেনে নেওয়া ভালো।
প্রবেশ ফি
প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য ৫০ টাকা, অপ্রাপ্তবয়স্ক (১২ বছরের নিচে) এবং পরিচয়পত্রধারী শিক্ষার্থীদের জন্য ২৫ টাকা এবং বিদেশী পর্যটকদের জন্য প্রবেশ ফি ৫০০ টাকা।
ফিল্মিং ফি
উক্ত বনে প্রফেশনাল গ্রেড শুটিং করতে প্রতিদিন গুণতে হবে ১০ হাজার টাকা। তবে সাধারণ ব্যবহারের জন্য ছবি, ভিডিও শুট করতে কোনো ফি প্রদান করতে হবে না।
পার্কিং ফিঃ
মোটরসাইকেল/সিএনজি এর জন্য ২৫ টাকা, প্রাইভেট কার/জিপ/মাইক্রোবাস ১০০ টাকা এবং বাস পার্কিং ফি ২০০ টাকা।
রাতারগুলে কায়াক এবং গাইড ভাড়া
জলার বন রাতারগুল ঘুরে দেখার জন্য কায়াক দারুণ একটি মাধ্যম। ইচ্ছেমত ঘোরার স্বাধীনতার পাশাপাশি রোমাঞ্চকর একটি অভিজ্ঞতা লাভের জন্য কায়াকিং এর বিকল্প নেই। বিশেষত বন্ধুদের সাথে গেলে কায়াকিং ভ্রমণের আনন্দকে একধাপ বাড়িয়ে দিতে যথেষ্ট। চৌরঙ্গি ঘাট থেকে কায়াক ভাড়া নেওয়া যায়।
এক ঘণ্টার জন্য জনপ্রতি খরচ পড়বে ১৫০ টাকা। একটি কায়াকে ৩ জন ওঠা সম্ভব। তবে সাঁতার না জানলে অবশ্যই লাইফ জ্যাকেট পরিধান করতে হবে। প্রথমবারের মত ঘুরতে গেলে সাথে গাইড নেওয়া ভালো। ঘণ্টাপ্রতি গাইডকে দিতে হবে ১৫০ টাকা।
রাতারগুল ভ্রমণে কত টাকা খরচ হয়?
রাতারগুল ভ্রমণের মোট খরচ নির্ভর করে আপনি সিলেট থেকে কোন মাধ্যমে যাবেন, কতজন ভ্রমণ করবেন, রিজার্ভ গাড়ি ব্যবহার করবেন কি না এবং কোন ঘাট থেকে নৌকা নেবেন তার ওপর। প্রবেশ ফি, যাতায়াত, নৌকা, খাবার ও অন্যান্য খরচ আলাদাভাবে হিসাব করা উচিত।
কোথায় থাকবেন ?
রাতারগুল জলাবনের ভেতরে থাকার ব্যবস্থা নেই। তবে আশপাশের ঘাট এলাকায় সীমিত আবাসনের ব্যবস্থা থাকতে পারে। বেশি সুযোগ-সুবিধা ও থাকার বিকল্পের জন্য সিলেট শহরে থাকা সুবিধাজনক।
কোথায় খাবেন?
রাতারগুলে খাবার ভালো হোটেল না থাকায় সিলেট শহর থেকেই খাওয়াদাওয়া সেরে নেওয়া উত্তম। সিলেটের রেস্তোরাঁগুলোর মধ্যে পানসী রেস্টুরেন্ট, পালকি রেস্টুরেন্ট এবং পাঁচ ভাই রেস্টুরেন্ট বেশ জনপ্রিয়। সকালের নাস্তার জন্য পরোটা, ডিম ভাজি, ডাল, সবজি ভাজি এবং দুপুর ও রাতের খাবারের জন্য ভাত, হরেক রকমের ভর্তা, সবজি, মাছ এবং মাংস পাওয়া যায় এসব রেস্তোরাঁয়।
ভ্রমণে সতর্কতা
রাতারগুল ভ্রমণে গেলে সাপ এবং জোঁকের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। রাতারগুলের ওয়াচ টাওয়ারটি রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকায় সেটিতে না ওঠাই উত্তম।
সিলেটের অন্যান্য দর্শনীয় স্থান
হাতে একটু সময় নিয়ে গেলে রাতারগুলের পাশাপাশি সিলেটের অন্যান্য দর্শনীয় স্থানসমূহ ঘুরে দেখা সম্ভব। এর মধ্যে হযরত শাহজালাল (রঃ) এর মাজার, জাফলং, লালাখাল, বিছনাকান্দি অন্যতম।
রাতারগুল সম্পর্কে সাধারণ প্রশ্ন
- রাতারগুল কোথায়?
রাতারগুল সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নে অবস্থিত।
- রাতারগুল কী জন্য বিখ্যাত?
রাতারগুল মিঠাপানির জলাবন, পানিতে অর্ধনিমজ্জিত গাছপালা এবং নৌকায় জলাবনের ভেতর ঘোরার অভিজ্ঞতার জন্য বিখ্যাত।
- রাতারগুল যাওয়ার সেরা সময় কখন?
বর্ষাকাল রাতারগুল ভ্রমণের সবচেয়ে জনপ্রিয় সময়। এ সময় জলাবনের স্বাভাবিক রূপ সবচেয়ে ভালোভাবে দেখা যায়।
- রাতারগুলের প্রবেশ ফি কত?
সরকার ২০২০ সালে রাতারগুলে বিভিন্ন প্রবেশ ও অন্যান্য ফি নির্ধারণ করেছিল। তবে বর্তমান ফি পরিবর্তিত হতে পারে। তাই ভ্রমণের আগে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সর্বশেষ ফি জেনে নেওয়া উচিত।
- রাতারগুলে নৌকা ভাড়া কত?
নৌকার ভাড়া ঘাট, নৌকার ধরন, সময় ও যাত্রীর সংখ্যার ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হতে পারে। নৌকা নেওয়ার আগে ভাড়া নিশ্চিত করে নেওয়া ভালো।
- রাতারগুলে থাকা যায় কি?
জলাবনের ভেতরে থাকার ব্যবস্থা নেই। আশপাশে সীমিত আবাসন থাকতে পারে। বেশি সুবিধার জন্য সিলেট শহরে থাকা যায়।
- রাতারগুলে কী কী দেখা যায়?
জলাবনের গাছপালা, প্রাকৃতিক পরিবেশ, বিভিন্ন পাখি, নৌপথ এবং ওয়াচ টাওয়ারসহ আশপাশের দৃশ্য দেখা যায়।
- রাতারগুলে কায়াকিং করা যায়?
স্থানীয়ভাবে কায়াকিংয়ের ব্যবস্থা পাওয়া যেতে পারে। ভাড়া ও প্রাপ্যতা মৌসুম ও স্থানীয় ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে পারে।
*তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ বন অধিদপ্তর, সিলেট জেলা প্রশাসন, বাংলাদেশ রেলওয়ে এবং সংশ্লিষ্ট স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।
ছবিটি তুলেছেনঃ Monzur Khan










