লালা খাল

লালা খাল সিলেট
শেয়ার করুন সবার সাথে

লালা খাল ভ্রমণ পরিকল্পনা

“দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া ঘর হইতে দুই পা ফেলিয়া”

যাদের এখনো বাংলার প্রকৃতির আনাচে কানাচে অমৃত সুধা আস্বাদন করতে বের হওয়া হয়ে উঠেনি, তাদের জন্য রবীন্দ্রনাথের এই  পঙক্তিটি একদম যথার্থই বটে। নদীর স্বচ্ছ পানিতে প্রতিফলিত হওয়া কুয়াশা ভেজা সবুজ পাতার বাঁকে পাহাড়ি বন ছুঁয়ে এক টুকরো ভূস্বর্গে সকাল থেকে সন্ধ্যায় প্রতি মূহুর্তে পাল্টে যাওয়া সৌন্দর্য অবলোকন করতে হলে আপনাকে যেতে হবে সিলেটের অদূরে অবস্থিত লালাখালে।

ভারতের চেরাপুঞ্জি পাহাড় থেকে উৎপন্ন এই নদী ঘিরে থাকা প্রকৃতির সান্নিধ্যে গেলে এর প্রেমে পরে যেতে হবে আপনাকে। জীবনানন্দ দাশের মত আপনিও বলতে বাধ্য হবেন, “বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর।”

বর্ষা যদি আপনাকে বিমোহিত করে রাখে, তবুও বর্ষায় লালাখালের প্রকৃত সৌন্দর্য আপনি অনুভব করতে পারবেন না।



এই জায়গাটিকে তার পরিপূর্ণ রূপে দেখতে চাইলে আপনাকে যেতে হবে শীতকালে। কেননা স্বচ্ছ পানি ও সবুজের মিতালী শুধুমাত্র এই সময়টাতেই দেখা যায়। আর বছরের বাকি সময়টাতে এখানকার পানি বেশ কিছুটা ঘোলাটে থাকে।

দিন কিংবা রাত, যখনই এই রূপ আপনি দেখেন না কেন, লালাখাল আপনার স্মৃতির একটি বড় অংশ হয়ে থেকে যাবে আজীবন। আর রাতে যদি আপনি জ্যোৎস্নায় সিক্ত হতে চান, তাহলে কিছুটা পূর্ব প্রস্তুতি আপনার থাকা লাগবেই। আজকের এই পর্বে লালা খাল ভ্রমণ পরিকল্পনা জানতে হলে আমাদের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত থাকুন আর জেনে নিন সব খুঁটিনাটি।

যেভাবে যাবেন 

লালাখাল যেতে হলে আপনাকে প্রথমেই সিলেট আসতে হবে। আর তাই দেশের বড় শহরগুলো থেকে সিলেটে কীভাবে আসবেন সেটা জেনে নিতে হবে আপনাকে।

ঢাকা থেকে যেভাবে যাবেন

জনপ্রতি মাত্র চারশ থেকে পাঁচশ টাকার মধ্যেই নন-এসি বাসে আপনি সিলেট চলে যেতে পারবেন। ঢাকা থেকে সিলেটগামী বাসগুলোর মধ্যে অন্যতম হল এনা পরিবহণ আর শ্যামলী পরিবহণ। এছাড়া আরো রয়েছে হানিফ, ইউনিক সহ অন্যান্য আরো কিছু বাস। এই বাসগুলোতে আপনি গাবতলি, সায়দাবাদ, ফকিরাপুল এবং মহাখালী বাস ষ্টেশন থেকে উঠতে পারেন।

আপনি যদি ভ্রমণে একটু আরাম নিয়ে আসতে চান তাহলে যেতে পারেন গ্রিন লাইন, সৌদিয়া এবং এস আলমের এসি বাসে। এসি বাসে যেতে হলে আপনাকে গুণতে হবে জনপ্রতি ৮০০ থেকে ১১০০ টাকা।

বাসগুলো সম্পর্কে আরো বিস্তারিত তথ্যাবলি জানতে চাইলে বাস কর্তৃপক্ষকে কল দিয়ে যোগাযোগ করতে পারেনঃ

হানিফ পরিবহণ— গাবতলি 02-9012902, 02-8056366, সায়দাবাদ 01713-402673, ফকিরাপুল

02-7191512, পান্থপথ 01713-402641

এনা পরিবহণঃ মহাখালী– 01760-737650, 01619-737650, ফকিরাপুল 01869-802736, 01872-604475, ফকিরাপুল 01869-802736,

গ্রীন লাইন—রাজারবাগ 02-9342580, কলা বাগান 02-9133145, ফকিরাপুল কাউন্টার 02-7191900।

সৌদিয়া– 01919-654926, কলাবাগান 01919-654926, কমলাপুর 01919-654859, গাবতলি 01919-654863

আপনি যদি ঢাকার বাইরে অন্য জায়গা থেকে ভ্রমণ করেন এবং সেখানের নাম্বার প্রয়োজন হয় তাহলে ঢাকার কাউন্টারগুলোতে যোগাযোগ করে ফোন নাম্বার চাইতে পারেন।



আর আপনি যদি ঢাকা থেকে ট্রেনে যেতে চান তাহলে উপবন, জয়ন্তিকা, পারাবত, কালনী এক্সপ্রেস ইত্যাদি ট্রেনগুলোতে করে সিলেট ভ্রমণ করতে পারবেন। এছাড়া আপনি বিমান বন্দন থেকে আকাশপথেও সিলেট ভ্রমণ করতে পারবেন। আকাশপথের বর্তমান ভাড়া সাড়ে তিন হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকার মধ্যে।

চট্টগ্রাম থেকে যেভাবে যাবেন 

চট্টগ্রাম থেকেও আপনি ঠিক ঢাকার মতই আকাশ, রেল এবং স্থলপথে সিলেট অভিমুখে যাত্রা করতে পারবেন। রেলযোগে সিলেট যেতে চাইলে পাহাড়িকা এবং উদয়ন এক্সপ্রেস দিয়ে যেতে পারবেন। চট্টগ্রাম থেকে নস এসি বাস যেমন এনা, সৌদিয়া, বি আর টি সাইট যেতে চাইলে আপনাকে গুনতে হবে জনপ্রতি পাঁচশ থেকে সাতশ টাকার মত। আর গ্রিন লাইন, সৌদিয়ার এসি বাসে করে যেতে চাইলে ভাড়া পড়বে ১১০০ থেকে ১২০০ টাকার মত।

দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে স্থানীয় আরো কিছু বাস দিয়েও আপনি সিলেট চলে আসতে পারবেন। সিলেট তো চলে আসলাম আমরা। এখন তাহলে জেনে নেই, সিলেট থেকে লালাখাল কীভাবে যাব, কোথায় থাকব, কি খাব আর খরচই বা কেমন হতে পারে সেগুলোর বিস্তারিত ভ্রমণ পরিকল্পনা।

সিলেট থেকে লালাখাল ভ্রমণ

সিলেট শহর থেকে লেগুনা, মাইক্রো কিংবা জাফলংগামী বাসে চড়ে আপনি যেতে হবে সারিঘাট। সারিঘাট মূলত সিলেট মূল শহর থেকে জাফলং এর দিকে যেতেই পরে। সিলেট শিশু পার্ক থেকে এই বাহনগুলো আপনি পেয়ে যাবেন। লেগুনা এবং বাসে করে সারিঘাট যেতে আপনার খরচ হবে জনপ্রতি চল্লিশ থেকে ষাট টাকা।



আর সারিঘাট থেকে লালাখাল যেতে হবে ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকায় ইঞ্জিন চালিত নৌকো দিয়ে আর স্পিডবোটে যেতে চাইলে খরচ হবে পনেরশ থেকে দুই হাজার টাকার মত।

আর আপনি যদি সিলেট শহর থেকে মাইক্রো বাসে করে লালাঘাট যেতে চান তাহলে আপনার তিন হাজার টাকার মত খরচ হতে পারে। তবে সারিঘাট থেকে কম খরচে লালাখাল যাওয়ার আরও রয়েছে উপায়। সারিঘাট উত্তর দিকের মসজিদ সংলগ্ন রাস্তায় অটো রিকশার স্ট্যান্ড দেখতে পাবেন। সেখানে আপনার খরচ হবে জনপ্রতি মাত্র ১৫ টাকা। আর অটো থেকে নেমে লালাখাল ঘাটে গেলেই প্রবেশ করবেন প্রকৃতির এক অপরূপ নিসর্গে।

এখানে আপনি নৌকা পাবেন ঘোরাফেরার জন্য। ৩০০ থেকে ৭০০ টাকার মধ্যে নৌকা ভাড়া করে সারাদিন ঘোরাফেরা  করতে পারবেন। এপার থেকে নৌকা নিলে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকার মত খরচ হবে। আর খেয়া ঘাট পার হয়ে নৌকো নিলে আরেকটু কম দামের মধ্যেই নৌকা পেয়ে যাবেন।

থাকবেন কোথায় 

লালখালের রাতে জ্যোৎস্নায় মাখামাখি অসাধারণ একটি সময় কাটাতে চাইলে সেখানে নর্দার্ন রিসোর্টে থাকার ব্যবস্থা করে নিতে পারেন। এছাড়া লালাখালের কাছেই আরেকটি রিসোর্ট রয়েছে।

খাদিমনগরে অবস্থিত এই নাজিম গড় রিসোর্টে আপনি রুম পেয়ে যাবেন। এখানকার প্রিমিয়াম রুমের ভাড়া সাত হাজার এবং প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুটের ভাড়া পনের হাজার টাকার মত। নাজিম গড় রিসোর্টে যোগাযোগ করতে চাইলেঃ (+88) 01926667444, 01747200100 এই নাম্বারে কল করতে পারেন।



তবে এই রুমগুলোর ভাড়া যদি আপনার কাছে একটু বেশি মনে হয় তাহলে লালা বাজার এবং দরগা রোডে চারশ থেকে এক হাজার টাকার মধ্যেই অল্প ভাড়ায় বেশ মান সম্মত বেশ কিছু হোটেল পেয়ে যাবেন। আর এখানেই আশেপাশে বেশ কিছু হোটেল পেয়ে যাবেন। খুল অল্প টাকার মধ্যেই এখানে আপনি খাবার সেরে নিতে পারবেন।

আর আপনি যদি সিলেট মূল শহরে থেকে আরো বিভিন্ন স্পটে ঘুরতে চান, তাহলে মাজার এলাকার আশেপাশে অসংখ্য হোটেল রয়েছে সেখানে বেশ অল্প টাকার মধ্যেই থাকতে পারবেন। প্রতি রাতে এক হাজার টাকার মধ্যেই আপনি ভালো হোটেল পেয়ে যাবেন।

তারমধ্যে যোগাযোগের জন্য কয়েকটি হোটেলের নাম্বার দিয়ে দেয়া হলঃ

  • The Grand Hotel 01970-793366
  • Britannia Hotel Sylhet 01784-646565
  • Hotel Payra 01300-817865
  • Nazal Dormitory Hostel 01971-873032

সিলেটের অন্যান্য দর্শনীয় কয়েকটি স্থান

  • রাতারগুল ( Ratargul Swamp Forest ) এই জলাভূমিটি সিলেট শহর থেকে প্রায় ছাব্বিশ কিলোমিটার দূরে গোয়াইনঘাট নামক একটি উপজেলায় অবস্থিত।
  • বিছানাকান্দি ( Bichanakandi ) রাতারগুল এবং বিছানাকান্দি একই এলাকায় অর্থাৎ গোয়াইনঘাটে অবস্থিত।
  • সাদা পাথর ( Sada Pathor ) ভোলাগঞ্জে অবস্থিত কিছুটা বিছানাকান্দির মতই সুন্দর পরিবেশের একটি জায়গা এই সাদা পাথর। নাম শুনেই হয়ত বুঝতে পেরেছেন, এখানকার পাথরগুলো একদম সাদা রঙের হয়ে থাকে আর এটাই এই পর্যটন স্পটের মূল আকর্ষণ।
  • মালনীছড়া চা বাগান ( Malonichora Tea Garden ) শহরের একদম কাছেই অবস্থিত হওয়ার কারণে, প্রায় সব সময়ই এখানে পর্যটকদের ভীর দেখতে পাওয়া যায়।

শেয়ার করুন সবার সাথে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!