সুন্দরবনঃ কোথায়, কখন যাবেন, কিভাবে যাবেন ও প্যাকেজের খরচ

Sundarbans forest Bangladesh
শেয়ার করুন সবার সাথে

সুন্দরবন কেন বিখ্যাত ?

এককভাবে পৃথিবীর সবথেকে বড় ম্যানগ্রোভ বন- সুন্দরবন। সুন্দরবনকে ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো ৭৯৮তম World Heritage হিসেবে ঘোষণা দেয়। জোয়ারের সময় সাগরের নোনতা পানি ঢোকে সুন্দরবনের খালগুলোতে। আবার ভাটার সময়ে নেমে যায় সে নোনতা পানি। তাই- এই বনের উদ্ভিদ্গুলোতে দেখা যায়- শ্বাসমূল। এমন একটি উদ্ভিদ হলো ‘সুন্দরী’ গাছ। সুন্দরী গাছের আধিক্যের কারণে এই বনের নামকরণ ‘সুন্দরবন’ করা হয় বলে ধারণা করা হয়।

সুন্দরবন কোথায় অবস্থিত?

বাংলাদেশ ও ভারত- দু’ দেশের ভূ-খন্ডেই রয়েছে সুন্দরবন। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের ৫ টি জেলায় সুন্দরনের অবস্থান। জেলাগুলো হলোঃ খুলনা,সাতক্ষীরা,বাগেরহাট,পটুয়াখালি ও বরগুনা।

সুন্দরবনের আয়তন কত?

মোট সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে রয়েছে ৬২%। বাংলাদেশ অংশের আয়তন ৬,০১৭ বর্গ কিলোমিটার। তবে  ১,৮৭৪ বর্গকিলোমিটারে জালের মতন ছড়িয়ে আছে জলাকীর্ণ অঞ্চল। হরেক পশু ও পাখ-পাখালির আশ্রয়স্থল হলো এই সুন্দরবন। রয়েল বেঙ্গল টাইগার এই বনের মূল আকর্ষণ। এছাড়াও রয়েছে কয়েক ধরণের হরিণ, বিচিত্র প্রজাতির পাখি, হরেক জীবজন্তু ও কীটপতঙ্গ। এছাড়াও নদী ও খালগুলোতে রয়েছে অসংখ্য প্রজাতির মাছ, স্তন্যপায়ী, সরীসৃপ ও উভচর প্রাণী। সুন্দরবন তার কোলে পরম মমতায় আগলে রেখেছে অজস্র এই প্রাণীগুলোকে।

সুন্দরবন ভ্রমণের উপযুক্ত সময়

শীতকাল- সুন্দরবন ভ্রমণের উপযুক্ত সময়। তাই নভেম্বর মাস থেকে শুরু থেকে ফেব্রুয়ারি মাস ই উপযুক্ত সময় ঘুরতে যাবার। তবে দিনে যেয়ে দিনেই ঘুরে আসতে পারেন করমজল ও হারবাড়িয়া থেকে।
দেশের ৫ টি জেলায় ছড়িয়ে আছে সুন্দরবন। তাই ভ্রমণের স্পট রয়েছে অনেকগুলো। সুন্দরবনের গহীন অংশ অসাধারণ সুন্দর। সতেজ সবুজে আচ্ছন্ন থাকে প্রতিটা কোণা। সাথে নিঝুম স্বব্ধতায় বনে হাঁটা একটি এডভেঞ্চারাস অনুভূতি তৈরি করে।

সুন্দরবনের দর্শনীয় ভ্রমণ স্থান

সুন্দরবন ঘুরতে গেলে যেমন পাবেন- প্রকৃতির নিস্তব্ধতা, তেমনি দেখতে পাবেন গা ছম-ছম অনুভূতি। আর অসাধারণ সুন্দর ও পরিষ্কার সমুদ্র সৈকত।সুন্দরবনের সবটা দেখা বেশ কষ্টসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ্য। বন বিভাগ থেকে অনুমতি নিয়ে কেবল নির্দিষ্ট কিছু স্পটে ঘুরতে যাবার অনুমতি মেলে। খুলনা , সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পটুয়াখালি ও বরগুনা দিয়ে সুন্দরবন ঘুরতে যাওয়া গেলেও খুলনা/মংলা দিয়ে ভ্রমণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। ৩-৪ দিনের ট্যুর প্লানে ঘুরতে পারেন- করমজল, হারবাড়িয়া, কছিখালি, কটকা, জামতলা, হিরন পয়েন্ট ও দুবলার চরে।

করমজল পর্যটন কেন্দ্র: সুন্দরবনে ভ্রমণ করতে প্রথমেই যেতে পারেন করমজল। এই স্পট ই সবথেকে কাছে মংলা থেকে। পশুর নদীর তিরেই এর অবস্থান। এর আয়োজন ৩০ হেক্টর। এখানে রয়েছে বন বিভাগের হরিণ ও কুমির প্রজনন কেন্দ্র। আর রেসাস বানরের দেখা তো পাবেন-ই- সুনিশ্চিতভাবে।

বনের ভেতর বিছানো রয়েছে সুবিশাল কাঠের পাটাতন। এখানে হাঁটতে পারেন বনের নিস্তব্ধতায়। মংলা হতে করমজল লঞ্চ বা ট্রলারে মাত্র ৪৫ মিনিটের পথ হওয়ায় দিনে যেয়ে দিনে ফিরে আসার সুবিধা এবং ভ্রমণে তুলনামূলক কম খরচের কারণে অধিকাংশ পর্যটকেরই সুন্দরবন ভ্রমণে প্রথম পছন্দের স্থান করমজল।

হারবাড়িয়া: হাড়বাড়িয়ার জায়গাটিতে বাঘের আনাগোনা রয়েছে। প্রায়ই বাঘের পায়ের তাজা ছাপ দেখা যায়। এছাড়া চিত্রা হরিণ ছাড়াও অন্যান্য বন্য প্রাণীও এখানে দেখা মিলবে। এখানের খালে রয়েছে কুমির। তবে কুমির দেখার ভালো সময় ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি। এই সময়ে রোদ পোহাতে কুমিরগুলো খালের চরে শুয়ে থাকে। হাড়বাড়িয়াতেই রয়েছে হাড়বাড়িয়া ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্র। ছোট খালের উপরে রয়েছে ঝুলন্ত সেতু। ঝুলন্ত সেতু পেরিয়ে সামান্য সামনে বিশাল এক পুকুর।

মংলা বন্দর থেকে সকালে হাড়বাড়িয়া গিয়ে সন্ধ্যার মধ্যেই আবার ফিরে আসা যায়। খুলনা কিংবা বাগেরহাট থেকে বাসে আসতে পারেন মংলা। মংলা থেকে ইঞ্জিন বোটে হাড়বাড়িয়া যেতে সময় লাগবে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা।
কটকা-র অবস্থান সাগর কোল ঘেষেই।

এখানেই রয়েছে কটকা অভয়ারন্য। বনের দক্ষিণে কিছুক্ষণ হাঁটলে চোখে পড়বে পরপর তিনটি টাইগার টিলা। এ টিলায় প্রায়ই বাঘের পায়ের ছাপ দেখা যায়। টাইগার টিলা থেকে সামান্য পশ্চিমে বয়ার খাল। খালের দুই পাশ কেওড়া, গোলপাতা আর নানান পাখির কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে থাকে চারপাশ। শীতে দেখা মেলে- রোদ পোহানো লোনা জলের কুমির। এখানেও রয়েছে কাঠের ট্রেইল। ট্রেইল ধরে হাঁটলে চোখে পরে হরিণের দল।

কটকা বিচ: কটকা থেকে খানিকটা এগুলেই পৌঁছে যাবেন কটকা সমুদ সৈকতে। এখানে দেখা মিলবে বঙ্গোপসাগরের। অসম্ভব সুন্দর লাল কাঁকড়ার দেখা মিলবে এখানে। পূর্বে দীর্ঘ বন আর মাঝে মিঠা জলের পুকুর। এখানে রয়েছে একটি ওয়াচ-টাওয়ার।

জামতলা সৈকত: জামতলা ঘাট থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার পায়ে হাঁটা পথে গেলে দেখা যাবে জামতলা সী-বীচের। হরেক জামগাছের সারি দেখবেন এখানে। লাল কাঁকড়ার দেখাও পাবেন এ সৈকতে। ভাগ্য ভালো থাকলে হরণের দল ও বাঘের এখাও পেতে পারেন। সৈকতটি সোজা পুবে গিয়ে শেষ হয়েছে কচিখালিতে।
মান্দারবাড়িয়া সৈকত: সুন্দরবনের এই সৈকতে যেতে আপনাকে ঢুকতে হবে সাতক্ষীরা দিয়ে। বঙ্গোপসাগরের কোল এ সৈকতের অবস্থান। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার জন্যে এ সৈকতটি অনিন্দ্য সুন্দর।

হীরন পয়েন্ট: এই অঞ্চলটি রয়েল বেঙ্গল টাইগারের উন্মুক্ত অভয়ারণ্য। হিরন পয়েন্ট একটি অভয়ারণ্য হওয়ায় এই স্থান প্রচুর বাঘ, হরিণ, বানর, পাখি এবং সরিসৃপের নিরাপদ আবাসস্থল। এখানে দেখা পাওয়া যায় চিত্রা হরিণ, বন্য শুকর। নীল কমল নদী পেরিয়ে যেতে হয় এই হীরণ পয়েন্টে। সুন্দরবনের মূল অংশ থেকে হিরন পয়েন্ট-কে বিচ্ছিন্ন করেছে এই নীল কমল নদী।

দুবলার চর: হিন্দুধর্মের পূণ্যস্নান, রাসমেলা এবং শুটকির জন্য বিখ্যাত এই দুবলার চর। হরিণের জন্য বহুল পরিচিত এই স্থান। কুঙ্গা ও মরা পশুর নদের মাঝে এটি ৮১ মাইলের একটি বিচ্ছিন্ন চর।
লাল বুক মাছরাঙা, মদনটাক পাখির দেখা পাওয়া যায় এ চরে। শুটকির জন্যে বিশেষভাবে বিখ্যাত দুবলার চর। এখানে ঘুরে দেখতে পারেন শুটকি পল্লী ও শুটকি প্রক্রিয়াকরণ।

সুন্দরবন ভ্রমণের উপায়

খুলনা থেকে শীপে উঠে মংলা হয়ে ঘুরতে যেতে পারেন সুন্দরবনে। চাইলে মংলা থেকেও উঠতে পারেন শীপে। একলা কিংবা অল্প ২/৩ জন মিলে সুন্দরবন ঘুরার প্ল্যান করাটা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কারণ ফরেস্ট অফিস থেকে পার্মিশন, নিরাপত্তারক্ষী যোগাড়, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, খরচ ও জটিল প্রক্রিয়ার কারণে কোন ‘ট্যুর অপারেটর’ এর মাধ্যমে শীপ/লঞ্চে করে সুন্দরবন ঘুরে দেখা নিরাপদ ও ঝঞ্ঝাটমুক্ত। ট্যুর প্যাকেজের ভেতর-ই পাবেন সুন্দর ঘুরে আবারো ঘাটে ফিরে আসার নিরাপদ সুযোগ। খাবার, ট্যুর প্ল্যান, অনুমতি, গাইডসহ যাবতীয় ব্যবস্থা করে থাকেন ট্যুর অপারেটরা।

সুন্দরবনে যাওয়ার উপায়

পদ্মাসেতু দিয়ে সহজেই সোজা চলে যাওয়া যায় খুলনা কিংবা বাগেরহাটের মংলায়। ঢাকা থেকে এখন সময় লাগে ৫-ঁ৬ ঘন্টা। সুন্দরবন ঢোকার সবথেকে জনপ্রিয় রুট খুলনা/মংলা হলেও সাতক্ষীরা, পটুয়াখালি ও বরগুনা দিয়েও ঢুকতে পারবেন সুন্দরবনে। বাসে ঢাকা থেকে খুলনাগামী  বাসগুলো হলো সোহাগ, এনা ও হানিফ পরিবহন। এছাড়াও রয়েছে টুংগিপাড়া, রয়েল, দোলা পরিবহন। নন-এসি/এসি ভাড়া পরবে ৬৫০-৭৫০ টাকা। বাসে ঢাকা থেকে মংলাগামী বাসগুলো হলো কমফোর্ট লাইন, দিগন্ত ও রাজধানী পরিবহন। নন-এসি/এসি ভাড়া পরবে ৮৫০ টাকার মতন। তবে ভালো মানের বাসগুলোতে যেতে প্রথমেই খুলনায় নেমে, ওখান থেকে মংলা যাওয়া ভালো সিদ্ধান্ত।
ট্রেন ঢাকা থেকে খুলনা যায় দুটি সময়ে- সকাল ও সন্ধ্যায়।  সকাল ০৮ঃ১৫ তে ছেড়ে যায় সুন্দরবন এক্সপ্রেস, আর সন্ধ্যা ০৭ঃ০০ তে ছেড়ে যায় চিত্রা এক্সপ্রেস। খরচ পরবে ৫০৫-১০০৫ টাকা। ট্রেনে সময় লাগে প্রায় ১০ ঘন্টা।

সুন্দরবন ভ্রমণ প্যাকেজের খরচ

ট্যুর অপারেটর এর মাধ্যমে সুন্দরবন ভ্রমণ ই সবথেকে সহজ। তারা বিভিন্ন খরচে কয়েক ধরণের প্যাকেজ তৈরি করে থাকে। প্যাকেজগুলোর ভিন্নতা হয়- খাবারের মান, দর্শনীয় স্থান ও ক’ দিনের ভ্রমণ- তার উপর নির্ভর করে।
এভারেজ মানের প্যাকেজে খরচ হবে ৯০০০-১৩০০০ টাকা। আর বিলাসবহুল টুরিস্ট ক্রুজ শীপে ভ্রমণে গুনতে হবে ১৫০০০-২৫০০০ টাকা। প্যাকেজগুলো প্রধানত তৈরি করা হয় ২ রাত ৩ দিন / ৩ দিন ৪ রাত কে মাথায় রেখে।
তবে ২০-৫০ জনের দল (কর্পোরেট ট্যুর) হলে নিজেই শীপ/লঞ্চ ভাড়া করে ফেলতে পারেন। আগে থেকেই বলে রাখবেন কেমন খাবার, থাকার ব্যবস্থা চাচ্ছেন। তাহলে সবকিছু সে মানের ই হবে। খরচ ও তাহলে নিজেদের আয়ত্তে থাকবে।

থাকবেন কোথায়

ট্যুর অপারেটরদের নির্ধারিত প্যাকেজের ভেতর-ই থাকার ব্যবস্থা থাকে। শীপ অথবা লঞ্চে সারাদিন ঘুরবেন এবং থাকার ব্যবস্থা এটাতেই।

ভ্রমণ টিপস

  • নেটওয়ার্কের স্বল্পতা রয়েছে সুন্দরবনে। অপারেটরদের মধ্যে টেলিটকের সার্ভিস বেটার।
  • ট্যুর এজেন্সি সম্পর্কে তথ্য আগেই নিশ্চিত হয়ে নিন।
  • প্রয়োজনীয় ঔষধ শহর থেকেই নিয়ে শীপে উঠবেন।
  • খরচ কমাতে ছুটির দিনগুলো এড়িয়ে যান।
  • দলছুট হয়ে যাওয়া যাবে না।
  • প্লাস্টিক বর্জ্য অবশ্যই সাথে করে ফিরিয়ে নিয়ে আসবেন।

শেয়ার করুন সবার সাথে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!