কক্সবাজার ট্যুর প্ল্যান

cox's bazar tour plan
শেয়ার করুন সবার সাথে

বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থান। চট্টগ্রাম বিভাগের অন্তর্গত দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত এই সমুদ্র সৈকতের দৈর্ঘ্য প্রায় ১২০ কিলোমিটার। কক্সবাজারের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের টানে প্রতিদিন দেশ বিদেশ থেকে অসংখ্য পর্যটক এখানে ছুটে আসেন। বঙ্গোপসাগরের বিস্তীর্ণ জলরাশি এখানে আসা পর্যটকদের মুগ্ধতার আবেশে জড়িয়ে নেয়। সমুদ্র এবং পাহাড় উভয়ের উপস্থিতি স্থানটিকে করে তুলেছে অনন্য। আজকের এই আর্টিকেলে কক্সবাজারের কোন স্থানে কোন দিন ঘুরবেন, কি খাবেন এবং কোথায় থাকবেন তার একটি সম্পূর্ণ দিক-নির্দেশনা থাকছে আপনাদের জন্য। 

কক্সবাজারের দর্শনীয় স্থানসমূহ 

সমগ্র কক্সবাজারজুড়ে রয়েছে দর্শনীয় বেশ কয়েকটি স্থান। নিচে তার একটি তালিকা প্রদান করা হলো –

১. কলাতলী, লাবণী ও সুগন্ধা সমুদ্র সৈকত

২. ইনানী সমুদ্র সৈকত

৩. গোয়ালিয়া

৪. মহেশখালী

৫. রেডিয়েন্ট ফিস ওয়ার্ল্ড 

৬. হিমছড়ি 

৭. মেরিন ড্রাইভ

৮. নাইক্ষ্যংছড়ি লেক 

৯. রামু

১০. সেন্টমার্টিন

ঢাকা থেকে কক্সবাজার যাওয়ার উপায় 

ঢাকা থেকে কক্সবাজারের দূরত্ব প্রায় ৩৯২ কিলোমিটার। এই পথ পাড়ি দিতে সময় লাগবে ৯ থেকে ১০ ঘণ্টা। হাতে সময় কম থাকলে রাতের বাসে ভ্রমণ করা উত্তম কারণ সেক্ষেত্রে দিনের সময়টা ঘোরার কাজে ব্যয় করতে পারবেন । রাত ১১টার দিকে রওয়ানা দিলে সাধারণত বাস সকাল ৯টার মধ্যে কক্সবাজার পৌঁছে যায়। কক্সবাজারের শহরের ডলফিন মোড়ে এসে বাসগুলোর যাত্রা শেষ হয়। ট্রেনে যেতে চাইলে চট্টগ্রাম নেমে সেখান থেকে বাসে করে কক্সবাজার যেতে হবে। 

হাতে থাকা সময় অনুসারে নানাভাবে পর্যটকেরা তাদের কক্সবাজার ট্যুর সাজিয়ে থাকেন। পর্যাপ্ত সময় নিয়ে গেলে সবগুলো স্পট ঘুরে দেখা সম্ভব হলেও সময় সীমিত হলে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে স্পট নির্বাচন করতে হয়। সেই কাজটিকে আপনাদের জন্য সহজ করে দেওয়ার জন্যই এই ট্যুর প্ল্যান। 

২ দিন ও ১ রাতের ট্যুর প্ল্যান 

যে সমস্ত জায়গায় ঘুরবেন ? 

১ম দিন ও রাত – সুগন্ধা সমুদ্র সৈকত, কলাতলী সমুদ্র সৈকত এবং লাবণী সমুদ্র সৈকত

২য় দিন –  মেরিন ড্রাইভ, গোয়ালিয়া, হিমছড়ি এবং ইনানী সমুদ্র সৈকত

১ম দিন ও রাত 

সকাল ৯টা থেকে ১২টাঃ বাস থেকে নেমে প্রথমেই নাস্তা সেরে নিন। এরপর বাজেট অনুসারে কোনো একটি হোটেলে রুম বুক করে নিন। ফ্রেশ হয়ে প্রয়োজনে কিছুটা বিশ্রাম গ্রহণ করুন।

দুপুর ১২টা থেকে বিকাল ৫টাঃ এবার বিচে যাওয়ার পালা। কাছাকাছি হওয়ায় দুপুর, বিকাল এবং রাত মিলিয়ে ১ দিনেই সুগন্ধা, কলাতলী এবং লাবণী বিচ ঘুরে দেখতে পারবেন। বিচে আসতেই সমুদ্রের বিশালতা আপনাকে বিমোহিত করে তুলবে। চাইলে এসময়ই সমুদ্রের পানিতে গা ভিজিয়ে দিতে পারেন। স্পীড বোটে করে সমুদ্র ভ্রমণেও বেরিয়ে পরতে পারেন। সেখান থেকে হোটেলে ফিরে গোসলের পর্ব সেরে দুপুরের খাবার খেয়ে নিন। হোটেলে ফিরে খানিকটা বিশ্রাম নিয়ে নিতে পারেন।

বিকাল ৫টা থেকে রাত ৮টাঃ বিকেলে সূর্যাস্ত উপভোগ করতে আবারও চলে যান বিচে। এসময় চাইলে প্যারাসেইলিং করে আকাশের রক্তিম আভা উপভোগ করতে পারেন। সন্ধ্যার পর বিচ সংলগ্ন দোকানগুলোতে ঢু মেরে আসুন। সামুদ্রিক পাথর এবং ঝিনুকের তৈরি বিভিন্ন জিনিস পেয়ে যাবেন এই দোকানগুলোতে। চাইলে স্মৃতি হিসেবে কিছু কিনে রাখতে পারেন। এসময় বিচ সংলগ্ন ফুড কার্টগুলো থেকে সামুদ্রিক বিভিন্ন মাছ এবং কাকড়া ফ্রাইয়ের স্বাদও নিয়ে দেখতে পারেন। 

রাত ১০টাঃ রাতের খাবার সেরে নিন। খাবার শেষে পুনরায় একবার সমুদ্রের গর্জন শুনতে ঘুরে আসতে পারেন বিচ থেকে। 

২য় দিন

সকাল ৫টা থেকে ৭টাঃ সমুদ্র ভ্রমণের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ সূর্যোদয়। তবে এই সূর্যোদয় দেখতে হলে ঘুমিয়ে থাকা চলবে না। খুব ভোরে চলে যেতে হবে সমুদ্র সৈকতে। সূর্যোদয়ের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য এবং চারিদিকের স্নিগ্ধতা আপনার মনে শান্তির এক অনুভূতি জাগ্রত করবে। সূর্যোদয় দেখা শেষে সকালের নাস্তা সম্পন্ন করে ফেলুন। 

সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১২টাঃ সকালের নাস্তা শেষ করে হোটেলে ফিরে ঘুমটা পূর্ণ করে নিতে পারেন। ১২টার মধ্যে খাওয়াদাওয়া সেরে নিন। 

দুপুর ১২টা থেকে সন্ধ্যা ৬টাঃ এবার মেরিন ড্রাইভের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ার পালা, উদ্দেশ্য হিমছড়ি, গোয়ালিয়া এবং ইনানী বিচ ঘুরে দেখা। সবগুলো স্পট ঘুরে দেখতে প্রায় ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা সময়ের প্রয়োজন হবে। স্পটগুলোতে যাওয়ার জন্য কক্সবাজার শহরের ডলফিন মোড় থেকে অটো, চান্দের গাড়ি সহ বিভিন্ন যানবাহন পেয়ে যাবেন। ভাড়া এবং স্পট সম্পর্কে আগেই চালকের সাথে কথা বলে নিতে হবে। তাহলে আর দেরি না করে শুরু করা যাক মেরিন ড্রাইভের যাত্রা। পৃথিবীর দীর্ঘতম এই মেরিন ড্রাইভ সড়কটি কলাতলী থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত। এই রাস্তা ধরেই  হিমছড়ি, গোয়ালিয়া এবং ইনানী বিচের উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে হবে। সমুদ্রের পাড় ঘেঁষে মেরিন ড্রাইভের এই পথচলা আপনার স্মৃতির পাতায় অম্লান হয়ে থাকবে। নিম্নে আজকের স্পট ৩টি সম্পর্কে বর্ণনা করা হলো – 

হিমছড়ি 

প্রথমেই চলে আসুন হিমছড়িতে। কক্সবাজার শহর থেকে হিমছড়ির দূরত্ব প্রায় ১২ কিলোমিটার। হিমছড়িতে প্রবেশের জন্য জনপ্রতি ৩০ টাকা দিয়ে টিকেট কাটতে হবে। এখানে আছে দৃষ্টিনন্দন পাহাড় ও ঝর্ণা। পাহাড়ে ওঠার জন্য রয়েছে সিঁড়ি। হিমছড়ির ঝর্ণার সৌন্দর্য এবং এখানের পাহাড় থেকে দৃশ্যমান বঙ্গোপসাগরের বিশালতা আপনাকে আবিভুত করবে। 

গোয়ালিয়া 

পরবর্তী গন্তব্য হলো গোয়ালিয়া। হিমছড়ি থেকে গোয়ালিয়ার দূরত্ব ১১ কিলোমিটারের কাছাকাছি। মেরিন ড্রাইভ ধরে ইনানি বিচে যাওয়ার পথে রেজুখাল ঘেঁষে মিনি বান্দরবান খ্যাত এই গোয়ালিয়ার অবস্থান। পাহাড় যারা ভালোবাসেন তারা এখানের সবুজে আচ্ছাদিত দৃষ্টিনন্দন পাহাড়গুলো দেখে বিমোহিত হবেন তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। 

ইনানী বিচ 

এবার চূড়ান্ত গন্তব্য ইনানী বিচে যাবার সময়। গোয়ালিয়া হতে ইনানী বিচের দূরত্ব প্রায় ১১ কিলোমিটার। পরন্ত বিকেলে মেরিন ড্রাইভের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে পৌঁছে যাবেন ইনানী বিচে। মূলত সূর্যাস্তটা এখান থেকে উপভোগের লক্ষ্যেই ইনানী বিচকে উপর্যুক্ত ৩টি স্থানের মধ্যে শেষে রাখা হয়েছে। ভাটার সময় এখানে প্রবাল পাথরের দেখা মেলে, এছাড়া সময়ে অসময়ে লাল কাঁকড়ার দেখাও পাওয়া যায়। পাশাপাশি এখানের সৈকতে আপনার চোখে পড়বে মাছ ধরার কাজে ব্যবহৃত ঐতিহ্যবাহী সাম্পান। ইনানী বিচ থেকে দেখা সূর্যাস্তের অপরূপ দৃশ্য আপনার দিনের সমাপ্তিকে সুন্দর করে তুলবে। 

(এই প্ল্যানে প্রথমে হিমছড়ি, পরে গোয়ালিয়া এবং সবশেষে ইনানী বিচ ভ্রমণের পরিকল্পনা দেওয়া হয়েছে। তবে আপনারা চাইলে স্পটগুলো অটো কিংবা জিপ চালকদের সাথে আলোচনা করে নিজেদের সুবিধামত সময়ে এবং আগে পরেও ঘুরে দেখতে পারেন। এছাড়া হাতে সময় কম থাকলে বা বেশি ঘুরতে না চাইলে ৩টি স্পটের পরিবর্তে যেকোনো ২টি স্পট ঘুরতে পারেন।) 

রাত ৮টা থেকে ১০টাঃ সন্ধ্যার পর কক্সবাজার হোটেলে ফিরে সবকিছু গুছিয়ে নিন। রাতের খাবার শেষে ফিরতি বাসে উঠে পড়ুন। 

৩ দিন ও ২ রাতের ট্যুর প্ল্যান

যে সমস্ত জায়গায় ঘুরবেন ? 

১ম দিন ও রাত – সুগন্ধা সমুদ্র সৈকত, কলাতলী সমুদ্র সৈকত এবং লাবণী সমুদ্র সৈকত

২য় দিন ও রাত – মেরিন ড্রাইভ, গোয়ালিয়া, হিমছড়ি, ইনানী সমুদ্র সৈকত এবং রেডিয়েন্ট ফিস ওয়ার্ল্ড 

৩য় দিন – মহেশখালী, রামু 

১ম দিন ও রাত

১ম দিন ও রাতের ট্যুর প্ল্যান উপরে উল্লেখিত।

২য় দিন

২য় দিনের ট্যুর প্ল্যান উপরে উল্লেখিত।

২য় রাত 

সন্ধ্যা ৭টাঃ দিনের ঘোরাঘুরি শেষে এবারের গন্তব্য রেডিয়েন্ট ফিস ওয়ার্ল্ড। এখানে যেতে হলে সিএনজি কিংবা অটো তে করে চলে আসতে হবে কক্সবাজার ঝাউতলায়। সেখান থেকে খানিকটা পথ এগুলেই পেয়ে যাবেন রেডিয়েন্ট ফিস ওয়ার্ল্ড। প্রবেশ ফি গুণতে হবে জনপ্রতি ৩০০ টাকা। এখানে আছে প্রায় ১০০ প্রজাতির মাছ। নীলাভ পানিতে মাছগুলোর চাঞ্চল্যকর চলাফেরা দেখতে দেখতে একটা ভালো সময় কাটাতে পারবেন এখানে। সম্পূর্ণটা ঘুরে দেখতে দেড় থেকে দুই ঘন্টা সময় প্রয়োজন পড়বে। 

রাত ১০টাঃ রাতের খাবার শেষে চাইলে রাতের সমুদ্র সৈকতের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন।

৩য় দিন

সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টাঃ আজকের প্রথম গন্তব্য সবুজে ঘেরা দেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ মহেশখালী। এখানে আসলে সুন্দরবনের ভ্রমণের কিছুটা স্বাদ পেয়ে যাবেন। কক্সবাজারের ৬ নং জেটি ঘাট থেকে মহেশখালী যাওয়ার জন্য স্পীডবোট ও ট্রলার পেয়ে যাবেন। জনপ্রতি স্পীডবোট ভাড়া ১০০ টাকা এবং ট্রলার ভাড়া ৬০ টাকা। প্রায় ৭ কিলোমিটারের এই পথ স্পীডবোটে এই পাড়ি দিতে সময় লাগবে ২০ মিনিট, অন্যদিকে ট্রলারে লাগবে ৪৫ মিনিটের কাছাকাছি সময়। দুপুরের মধ্যে মোটামুটি মহেশখালী ঘুরে কক্সবাজার ফিরে আসতে পারবেন।

দুপুর ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টাঃ দুপুরের খাবার শেষে রওয়ানা দিন রামু বৌদ্ধ বিহারের পথে। বৌদ্ধদের বেশ কিছু নিদর্শনের দেখা মিলবে সমগ্র এই স্থানজুড়ে।
সন্ধ্যা ৭টাঃ কক্সবাজার ফিরে হোটেলে গিয়ে সব গুছিয়ে নিন। রাতের খাবার গ্রহণের পর ফিরতি বাসে উঠে যান।


শেয়ার করুন সবার সাথে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!