কাপ্তাই লেক

কাপ্তাই লেক
শেয়ার করুন সবার সাথে

যে বাংলার রূপ দেখে জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন রূপসী বাংলা। সেই বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছাড়িয়েও যে মানুষের তৈরি কোন জলাশয় দেখে ঠিক জীবন বাবুর মতই জালাঙ্গীর ভেজা শরীরে হাঁসের মত পরে থাকতে ইচ্ছে করবে সেটা ভাবতেও ভীষণ অবাক হতে হয়। হ্যাঁ! এই কাপ্তাই লেক (Kaptai Lake) দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ কৃত্রিম জলাশয় হলেও প্রকৃতি এখানে তার রূপ রসের পাখা মেলতে একটুও দ্বিধা বোধ করেনি।

চার পাশে উঁচু নিচু পাহাড়ি গা ছমছমে আঁকাবাঁকা পথ, পাশেই কয়েকশ ফুট গভীর খাদ। এই ভয় পাড়ি দিয়েই যখন সামনে দেখবেন এক বিশাল জলাশয়ে পাহাড় ঘেঁষা মেঘেরা খেলা করছে প্রতিবিম্ব হয়ে, সেখানে পাখি কিংবা জলজ হাঁস হয়ে পড়ে থাকতে ইচ্ছে করবে আপনার ভ্রমণ পিয়াসু মনের।

কি ইচ্ছে করছে এই পাহাড়, টিলা, আর অসংখ্য ছমছমে গিরিপথ ছুঁয়ে বেড়ে ওঠা এই নৈসর্গিক দৃশ্যকে চোখ দিয়ে একটু ছুঁয়ে দেখতে? এর জন্য তবে আপনাকে যেতে হবে রাঙামাটি জেলার কাপ্তাই নামক একটি উপজেলায়। প্রায় এগার হাজার বর্গ কিলোমিটার এই হ্রদ ঘিরে প্রকৃতির নানা রূপ ও বৈচিত্র্যময় প্রাণী জগত আপনাকে মনোমুগ্ধকর অবস্থায় রেখে দেবে। আর যদি বর্ষার সময় সেখানে যেতে পারেন, তাহলে চারপাশের পাহাড়ি ঝর্ণাগুলোও উপভোগ করে আসতে ভুলবেন না। আসুন তবে আমাদের সাথে একবার ঘুরে আসুন এই বৈচিত্র্যময় জগতে।

কখন তৈরি করা হয়েছিল কাপ্তাই লেক?



প্রকৃতির এই জলজ কাব্যটি তৈরি হয়েছিল ১৯৫৬ সালের দিকে। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে একটি বাঁধ তৈরি করে কর্ণফুলী নদীর উপর। এই বাঁধের উদ্যেশ্য ছিল পানি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য। আর কিছুটা ঈশ্বরের আশীর্বাদ স্বরূপ তখন অনেকগুলো এলাকা প্লাবিত হয়ে জন্ম নেয় এই কাপ্তাই লেক।

যাবেন কিভাবে

আপনি যদি ঢাকা থেকে কাপ্তাই লেকে যেতে চান তাহলে আপনি সরাসরি কাপ্তাই লেকে চলে যেতে পারবেন বাসের মাধ্যমে। পথিমধ্যে যদি কোন দীর্ঘ জ্যাম না থাকে তাহলে আপনার সময় লাগতে পারে সাত থেকে আট ঘন্টার মত। সায়েদাবাদ অথবা কমলাপুর থেকে আপনি বাসে করে যেতে পারলেও ঢাকার অন্যান্য আরো বেশ কিছু স্থান থেকেও আপনি এস,আলম, শ্যামলী, হানিফ পরিবহনের বাসের মাধ্যমে যাত্রা করতে পারবেন।

নন এসি বাসে আপনার ভাড়া গুনতে হবে পাঁচশ থেকে ছয়শ টাকার মত, আবার এসি বাসে নয়শ টাকার মধ্যেই আপনি খুব আরামে কাপ্তাই লেকে পৌঁছে যেতে পারবেন।

এছাড়া আপনি যদি চট্টগ্রাম থেকে কাপ্তাই লেকে যেতে চান তাহলে আপনাকে প্রথমেই আসতে হবে বদ্দারহাট বাস স্ট্যান্ড। এখানে আপনি দেখতে পাবেন যে, কিছুক্ষণ পরপরই বাস এখান থেকে কাপ্তাইয়ের উদ্যেশ্যে রওয়ানা হচ্ছে। এখান থেকে কাপ্তাই লেকে যেতে আপনার সময় লাগবে প্রায় দুই ঘণ্টার মত এবং ভাড়া পড়বে আশি থেকে একশ বিশ টাকার মত।



ট্রেনে করে কাপ্তাই লেক সরাসরি যাওয়ার কোন ব্যবস্থা আপাতত হয়ে উঠেনি। তবে আপনি যদি ভ্রমনে রেলপথের আমেজ নিয়ে আসতে চান, তাহলে চট্টগ্রাম পর্যন্ত রেলপথে এবং পরবর্তী রাস্তা বাসে করে যেতে পারেন। যাতায়াত ব্যবস্থার ধরন অনুযায়ী আপনার খরচ এবং বাস/ট্রেন এর সময়সূচি বিস্তারিত জানতে পড়ুন ।

ভিডিও দেখুনঃ

খাবেন কোথায়  

পূর্বে কাপ্তাই লেকে খাওয়া দাওয়া নিয়ে কিছুটা ঝক্কি পোহাতে হলেও বর্তমানে এটি একটি স্বনামধন্য পর্যটন এলাকা হয়ে যাওয়ায় এই লেক ঘিরে গড়ে উঠেছে কিছু রেস্তোরাঁ। আপনি এগুলোর যে কোন একটি থেকেই খাবার খেতে পারবেন। আর আপনি যদি মাছে ভাতে বাঙালী তত্তে বিশ্বাসী হয়ে থাকেন তাহলে এখানকার তাজা মাছ পাবেন এইসব হোটেলে।

সকাল দশটা থেকে এক টানা ১২ ঘণ্টা অর্থাৎ রাত দশটা পর্যন্ত এইসব হোটেলে আপনি বেশ স্বল্প মুল্যেই খাবার খেতে পারবেন। কাপ্তাইয়ের কাছাকাছি কয়েকটি জনপ্রিয় খাবার জায়গা হল লেক শোর হোটেল, জুম রেস্তোরাঁ, প্যারাডাইস ক্যাফে।

থাকবেন কোথায়

কাপ্তাই লেকে বেশ কিছু ভালো খাবার হোটেল গড়ে উঠলেও থাকার জন্য অনেক উন্নত তেমন কোন হোটেল এখন পর্যন্ত সেখানে তৈরি করা হয়নি। আর তাই সেখানে যদি আপনি রাত্রি যাপন করতে চান তাহলে সরকারি রেস্ট হাউসের কর্তৃপক্ষের সাথে আগে থেকেই কথা বলে আসবেন।

এছাড়াও সেনাবাহিনী, পিডিবি এবং বন বিভাগেরও কিছু রেস্ট হাউজ রয়েছে, সেগুলোতেও আপনি অনুমতি সাপেক্ষে রাতে থাকতে পারবেন।



এছাড়া কয়েকটি পিকনিক স্পট রয়েছে। যেমন, লেক শোর, লেক প্যারাডাইস, জুম রেস্তোরাঁ । জুম রেস্তোরাঁতে থাকার জন্য ভিন্ন ৩ টি কটেজ আছে। সেগুলোর ভাড়া প্রতি রাতের জন্য ১৫০০ থেকে ২৫০০ টাকা হয়ে থাকে। তাছাড়া আপনি যদি আরেকটু বেশি বাজেটের মধ্যে থাকতে চান তাহলে লেক শোর অথবা লেক প্যারাডাইসের রিসোর্টগুলোতে ওঠতে পারেন। এগুলোর ভাড়া ৩০০০ থেকে ৫০০০ টাকা হয়ে থাকে। তবে লেক শোর এবং লেক প্যারাডাইসে থাকতে হলে ডিফেন্সে চাকরি করে এমন একজন অফিসারের রেফারেন্স লাগবে।

কাপ্তাই ভ্রমণ করতে গেলে সবাই সাধারণত রাঙামাটি শহরে রাতে থাকে। কেননা রাঙ্গামাটিতে বেশ ভালো ভালো হোটেল রয়েছে থাকার জন্য। যেহেতু রাঙামাটি থেকে কাপ্তাই লেক একদমই কাছাকাছি, তাই এখানে থেকেই আপনি কাপ্তাই লেক যেয়ে ঘুরাঘুরি করতে পারবেন। রাঙ্গামাটিতে কিছু হোটেলের তথ্য নিম্নে দেয়া হল, আশা করি আপনার উপকারে আসবে এই তথ্যগুলোঃ

হোটেলের নাম ফোন নাম্বার
হোটেল গোল্ডেন হিল (Golden hill) 01820-304714
হোটেল গ্রিন ক্যাসেল (Green Castle) 61200
হোটেল লেক ভিউ (Lake View) 62063
হোটেল সুফিয়া (Hotel Sufiya) 62145

কাপ্তাই লেকে যেভাবে ঘুরতে পারেন

জলের ছোঁয়ায় চাইলেই কাপ্তাই লেকের ভ্রমণ সময়টা আরো সুন্দর করে তুলতে পারেন। আর এর জন্য আপনাকে লেক প্যারাডাইস নামক একটি পিকনিক স্পটে চলে আসতে হবে। এখান থেকে কাপ্তাই লেকে নৌ ভ্রমণ আপনার জন্য হতে পারে মনে রাখার মত একটি অভিজ্ঞতা। চোখ জুড়ানো নয়নাভিরাম এই সৌন্দর্য আপনি স্পিডবোট কিংবা নৌকা রিজার্ভ করে অবলোকন করতে পারেন।



ইঞ্জিন চালিত নৌকা আপনি দুইশ থেকে তিনশ টাকার মধ্যে এক ঘণ্টার জন্য ভাড়া নিয়ে নিতে পারেন। লেক প্যারাডাইস ছাড়াও জুম রেস্তোরাঁতে পাবেন নৌকা ভ্রমণ আর কায়াকিং এর সুব্যবস্থা।

ভ্রমণ টিপস

  • যাত্রাপথ সম্পর্কে আগে থেকেই একটি বিস্তারিত ধারণা নিয়ে রাখবেন
  • যদি অগ্রিম টিকেট কেটে থাকেন, তাহলে বাসা থেকে বের হওয়ার সময় টিকেট চেক করে নিন।
  • মোবাইল চার্জার ও মানিব্যাগ সাথে আছে কি না চেক করে নিন।
  • ভ্রমণের বিস্তারিত অবশ্যই কাছের কাউকে জানিয়ে নিন।
  • যদি পর্যটন পিক টাইমে ভ্রমণ করেন, তাহলে আগে থেকে হোটেলে বুকিং দিয়ে রাখা ভালো।

সতর্কতা

  • যদি গ্রুপ আকারে কাপ্তাই লেকে ঘুরতে যান, তাহলে কায়াকিং করার আগে শিউর হয়ে নিন সবাই সাতার পারে কি না।
  • যেখানে সেখানে ময়লা ফেলে প্রকৃতির সৌন্দর্য নষ্ট করবেন না

আশেপাশের অন্যান্য দর্শনীয় স্থান

ছবিঃ Monzur Khan


শেয়ার করুন সবার সাথে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!