যানবাহন, মানুষ, ধূলাবালি আর ইট পাথরে চাপা পড়ে যাওয়া এক শহর – আমাদের ঢাকা। নেই নি:শ্বাস নেয়ার ফুরসত। একদিনর ছুটিতে কোথায় একদন্ড শান্তি মিলবে খুঁযে পাওয়া দায়। নগরবাসীর বিরামহীন যাত্রা আর শান্তি খোঁজার এই দোলাচলে ঢাকার কাছাকাছি রয়েছে নারায়নগঞ্জের দর্শনীয় স্থান জিন্দা পার্ক। কোথায় অবস্থিত পার্কটি, কীভাবে যাবেন, টিকেট মূল্য, সময়সূচি, বন্ধের দিন- জানবো এই লেখায়।
জিন্দা পার্ক গড়ে ওঠা এবং প্রায় দুই দশক ধরে যাত্রা অব্যাহত রাখার গল্পটি একটু অন্যরকম। প্রতিষ্ঠাতা তবারক হোসাইন কুসুমসহ চার বন্ধুর পরিবেশকে বাঁচিয়ে আধুনিক একটি অবকাঠামো গড়ে তোলার স্বপ্নস্বরূপ এই পার্কের যাত্রা শুরু হয় অগ্রপথিক পল্লী সমিতির হাতে শান্তিকানন নামে। পৈতৃকভাবে পাওয়া ৩৩ একর জমিতে তবারক হোসাইন কুসুম পার্ক প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করেন। বর্তমানে পার্কটির মোট জমির পরিমাণ একশো একর প্রায়।
দীর্ঘদিন রাজউক এর পূর্বাচল প্রকল্পের জন্য পার্কটির ব্যাবস্থাপনা নিয়ে বিরোধ ছিলো। বিরোধ শেষে ২০১৪ সালের পর পার্কের নাম শান্তিকানন থেকে হয় জিন্দা পার্ক।
পার্কে প্রায় ২৫০ প্রজাতির গাছ রয়েছে যার অধিকাংশের রোপণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করেছেন গ্রামবাসীরা। পার্কটির পরিবেশগত বৈচিত্র অক্ষুণ্ণ এবং স্থাপত্যের নির্মানশৈলীর সাথে পরিবেশের ভারসম্য রাখতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে একটি দক্ষ পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা কমিটি, সার্বক্ষণিক নিরাপত্তাকর্মী এবং গ্রামবাসীর স্বতস্ফূর্ত সহযোগিতা।
জিন্দা পার্ক কোথায় অবস্থিত ?
ঢাকার পাশের জেলা নারায়ণগঞ্জ। নারায়নগঞ্জের উপজেলা রূপগঞ্জ। যেখানে রয়েছে দাউদপুর নামক ইউনিয়ন। এখানকার একটি গ্রাম যাকে বলা হয় আদর্শ গ্রাম, নাম জিন্দাগ্রাম। জিন্দা গ্রামে এই পার্কটির অবস্থান।
জিন্দা পার্কে দেখার কি কি আছে ?
এটি বাংলাদেশের একমাত্র পার্ক যেখানে একইসাথে অবস্থান করছে পরিবেশ ও স্থাপনা। ইকো ফ্রেন্ডলি পরিবেশের লক্ষ্যে রোপণ করা হয়েছে বিশ হাজারের বেশি গাছ যা পাখিদের অভায়রণ্যে পরিণত হয়েছে। ড্রোন ভিউয়ে পার্কিটিকে বিনোদনকেন্দ্রের চেয়ে বেশি সবুজের উদ্যান বলে মনে হয়।
বিনোদনের উদ্দেশ্যে তৈরি করা হলেও পার্কের প্রবেশদ্বার পার হলেই রয়েছে একটি অত্যাধুনিক নির্মাণের স্কুল। এই গ্রামের সন্তানেরাই এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। প্রাকৃতিক আলো, বাতাস চলাচলের ব্যাবস্থা রয়েছে ক্লাসগুলোতে। বিদ্যালয়ের সামনেই আছে মাঠ। এরপাশেই রয়েছে মসজিদ। মসজিদে রয়েছে পঞ্চভুজ আকৃতির ওজুখানা। মসজিদ পেরিয়ে একটি রাস্তা চলে গিয়েছে মহুয়া রেস্টুরেন্টে।রেস্টুরেন্টের খাবারের গুণ ও মানের সুনাম রয়েছে বেশ। বিভিন্ন জায়গায় বিশ্রাম নেওয়ার জন্য বসার ছাউনি। রয়েছে মাটির বাড়ি, বাড়ির বাসিন্দা মূলত পার্কের কর্মচারীরা। ভেতরে রয়েছে ট্রি হাউজ যা আমরা সচারাচর দেখে অভ্যস্ত না। পার্কটিকে ঘিরে রেখেছে পাঁচটি কৃত্রিম লেক।লেকগুলোর উপর রয়েছে বাঁশের সাঁকো। একটি লেকে আবার ড্রাম দিয়ে তৈরি অদ্ভুত সাঁকো বানানো হয়েছে। লেকের পাশ দিয়ে গিয়েছে লালমাটির রাস্তা। ভেতরে রয়েছে কুটির শিল্পের দোকান। এসব দৃশ্য আমাদের ঐতিহ্যকে স্মরণ করিয়ে দেয়। পার্কে আছে একটি মিনি চিড়িয়াখানা। পার্কের উত্তর পাশে রয়েছে প্রতিষ্ঠাতা কুসুমের বাসভবন। তবে জিন্দাপার্কের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পরিকল্পনা হচ্ছে এর লাইব্রেরি। একটি সুন্দর বিল্ডিং এ বেশ সুপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা এই লাইব্রেরিটি মন কেড়েছে সকলের। জিন্দা পার্কের অদ্ভুত আকর্ষণীয় স্থাপনাগুলোর ডিজাইনার ও নির্মাতা ছিলেন সায়েদুল হাসান রানা। মাটি, পানি, গাছ, ইট, বাঁশ সব মিলিয়ে এক অন্যরকম মুন্সীয়ানার প্রতিফলন এই জিন্দাপার্ক।
জিন্দা পার্ক কবে বন্ধ থাকে ?
পার্ক সাধারণত দুই ঈদের দিন বন্ধ থাকে। এছাড়া কর্তৃপক্ষ বিশেষ কারণে বন্ধ রাখার প্রয়োজন বোধ করলে, তা আগেই জানিয়ে দেয় জিন্দা পার্কের ওয়েবসাইটে।
জিন্দা পার্ক প্রবেশ মূল্য বা টিকেট প্রাইস
পার্কে প্রবেশে পাঁচ বছরের বেশি শিশুদের টিকেটমূল্য ৫০ টাকা। সরকারি বন্ধের দিন টিকেটমূল্য ১৫০/- এবং সাধারণ দিনে ১০০/-।
জিন্দা পার্ক সময়সূচি
পার্ক প্রতিদিন সকাল ১০ টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে।
জিন্দা পার্কে কিভাবে যাবেন ?
ঢাকা-কাঞ্চন ব্রীজ হয়ে: ঢাকার আব্দুল্লাহপুর, উত্তরা, টংগী স্টেশন রোড, গাউছিয়া, কুড়িল বিশ্বরোড BRTC বাস (ভাড়া ৪০/৫০ টাকা) কিংবা অটো/CNG তে ৩০০ ফিট রাস্তা ধরে কাঞ্চন ব্রীজ পৌছাতে হবে। কাঞ্চন ব্রীজ থেকে সরাসরি জিন্দা পার্কে অটো বা CNG তে মাত্র ২০ মিনিটে ৩০/৪০টাকা ভাড়ায় পৌছানো যায় পার্কে।
ঢাকা-ভুলতা হয়ে: ঢাকা থেকে কাচপুর ব্রীজ পেরিয়ে ভুলতা। ভুলতা থেকে মহানগর বাইপাস মাত্র ১২ কি:মি: গেলেই পার্কে পৌছানো যাবে।
ঢাকা-মীরের বাজার হয়ে : CNG/ অটো রিজার্ভ করে টংগী মীরের বাজার বাইপাস রাস্তা ধরে যাওয়া যায় জিন্দা পার্ক। ফেরার সময়েও কাঞ্চনব্রীজ হয়ে রিজার্ভ অটো বা সি এন জি নিয়ে ফেরা যায়। এভাবে সারাদিন রিজার্ভ অটো/ সি এন জি ভাড়া পড়বে ৬০০-৭০০।
জিন্দাপার্ক পরিবেশ রক্ষাকারী সামাজিক সংগঠন হিসাবে চালু হয়েছিলো। আজ এই পার্ক আমাদের জাতীয় সম্পদ। আমরা চাই বিশ্ববাসীর দূয়ারে নিরিবিলি, নির্ঝঞ্ঝাট এই নির্মল ভালোবাসার স্থাপনাটি পৌঁছে যাক।জিন্দাগ্রামের ভালোবাসার এই নিদর্শন আমাদের উৎসাহিত করুক আরো অনেকগুলো পরিবেশবান্ধব নমুনা স্থাপনার।
জিন্দাপার্কে পিকনিক করতে চাইলে নির্ধারিত দিনের ২-৩ দিন পূর্বে পার্ক কর্তৃপক্ষকে জানানোর মাধ্যমে বুকিং করে রাখতে হবে। আপনাদের সুবিধার্থে নিচে পার্কটির ফোন নম্বর এবং ওয়েবসাইটের লিংক দেওয়া হলো –
ফোনঃ০১৭১৬২৬০৯০৮, ০১৭১৫০২৫০৮৩, ০১৭২১২৬৬৬১০
ওয়েবসাইটঃ https:zindapark.com
জিন্দাপার্ক পরিবেশ রক্ষাকারী সামাজিক সংগঠন হিসাবে চালু হয়েছিলো। আজ এই পার্ক আমাদের জাতীয় সম্পদ। আমরা চাই বিশ্ববাসীর দূয়ারে নিরিবিলি, নির্ঝঞ্ঝাট এই নির্মল ভালোবাসার স্থাপনাটি পৌঁছে যাক।জিন্দাগ্রামের ভালোবাসার এই নিদর্শন আমাদের উৎসাহিত করুক আরো অনেকগুলো পরিবেশবান্ধব নমুনা স্থাপনার।
জিন্দা পার্ক সম্পর্কিত নানাবিধ প্রশ্নের উত্তর সংক্ষেপে জেনে নিন
জিন্দা পার্ক কোথায় অবস্থিত?
নারায়নগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলার দাউদপুর ইউনিয়নে পার্কটি অবস্থিত।
জিন্দা পার্ক যাওয়ার উপায় কী?
ঢাকা উত্তরা বা আব্দুল্লাহপুর থেকে বাস/CNG করে অথবা ৩০০ ফিটের সুন্দর হাইওয়ে ধরে নিজস্ব গাড়ি/ মাইক্রোতে পার্কে যাওয়ার সহজ ব্যবস্থা আছে।
নারায়ণগঞ্জ বা সাইনবোর্ড থেকে বাসে জিন্দা পার্ক কিভাবে যাবো ?
- সাইনবোর্ড থেকে সিলেটগামী যে কোনো বাসে উঠুন।
- তারপর ভূলতা গাওসিয়া এলাকায় নামুন।
- তারপর সেখান থেকে ৩০০ ফিটগামী BRTC বাসে উঠুন।
- তারপর কাঞ্চন ব্রিজে নেমে একটা অটোচালকে বললে জিন্দা পার্ক গেট বা জিন্দা পার্ক রোড বললে নামিয়ে দেবে।
- মিরপুর (১০/১১/১/১২) থেকে গুলিস্তান বা সাইনবোর্ডগামী বাসে উঠে পড়ুন।
- তারপর সাইনবোর্ড নেমে ভুলতা গাওসিয়াগামী বাসে উঠুন।
- ভূলতা গাওসিয়া নেমে ৩০০ ফিটগামী বিআরটিসি বাসে উঠে কাঞ্চন ব্রিজের নেমে পড়ুন।
- তারপর একটা অটোচালককে বললে জিন্দা পার্ক বা জিন্দা পার্ক রোড বললে নামিয়ে দেবে।
জিন্দা পার্ক দেখার কী আছে?
ইটের রাস্তা, আধুনিক স্থাপনা, মসজিদ, স্কুল,কৃত্রিম লেক কী নেই জিন্দাপার্কে! নির্মল বাতাসে নি:শ্বাস নেওয়া থেকে চোখ আর মনকে শান্ত করার জন্য লেক, লাইব্রেরি সব ই আছে একই আঙ্গিনায়।
জিন্দা পার্কের টিকেটের মূল্য কত?
৫ বছরের উর্ধ্বে শিশু : ৫০/-
জনসাধারণ (সাধারণ দিন) : ১০০/-
জনসাধারণ (শুক্রবার ও সরকারি ছুটি) : ১৫০/-
জিন্দা পার্কে প্রবেশের সময়সূচী :
সকাল ৭ টা থেকে মাগরিব পর্যন্ত।
জিন্দা পার্ক কবে বন্ধ থাকে?
দুই ঈদের দিন ছাড়া সারাবছর খোলা থাকে জিন্দাপার্ক।










