কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার অবস্থিত একটি জনপ্রিয় প্রাকৃতিক দর্শনীয় স্থান হিমছড়ি জাতীয় উদ্যান। এখানে অবস্থিত হিমছড়ি ঝর্ণা বর্ষাকালে সবচেয়ে বেশি মনমুগ্ধকর রূপ ধারণ করে। এই আর্টিকেলের মাধ্যমে আমরা জানবো হিমছড়ি কোথায় অবস্থিত, এর ঝর্ণা ও পাহাড়ের বৈশিষ্ট্য। এছাড়া আমরা জানবো হিমছড়ি ভ্রমণের সেরা সময়, কিভাবে যাব, কোথায় থাকব এবং কি খাব। পাশাপাশি এই আর্টিকেলে টিকিট মূল্য ও ঘোরার জায়গা সম্পর্কেও প্রয়োজনীয় তথ্য তুলে ধরা হবে।
হিমছড়ি ঝর্ণা কোথায় অবস্থিত?
হিমছড়ি ঝর্ণা কক্সবাজার জেলা সদর থেকে প্রায় ৯-১২ কিলোমিটার দক্ষিণে, মেরিন ড্রাইভ সড়কের পাশে অবস্থিত। এটি হিমছড়ি জাতীয় উদ্যান-এর ভিতরে রয়েছে। পাহাড়, ঝর্ণা ও সমুদ্রের মিলিত সৌন্দর্যের জন্য এটি ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়।
হিমছড়ি ভ্রমণের সেরা সময় কখন?
শীতকাল, এই সময়ে আবহাওয়া তুলনামূলক শুষ্ক ও ঠান্ডা থাকে। তীব্র গরম বা বৃষ্টির ঝামেলা থাকে না। মেরিন ড্রাইভ দিয়ে যাতায়াত করা এবং হিমছড়ির পাহাড়ি সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠা বেশ স্বস্তিদায়ক হয়। এই সময়ে ঝর্ণার পানির প্রবাহ অনেকটাই কমে যায়।
বর্ষাকাল, অর্থাৎ জুন থেকে সেপ্টেম্বর, হিমছড়ি ঝর্ণা ভ্রমণের সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। এ সময় টানা বৃষ্টিপাতের কারণে ঝর্ণার পানির প্রবাহ অনেক বেড়ে যায় এবং চারপাশের পাহাড়-জঙ্গল সতেজ সবুজে ভরে ওঠে। ঝর্ণার গর্জন আর প্রকৃতির অপূর্ব সৌন্দর্য একসঙ্গে উপভোগ করতে চাইলে বর্ষাকালই সেরা। তবে ভারী বৃষ্টির কারণে পাহাড়ি পথ ও সিঁড়ি পিচ্ছিল হয়ে যেতে পারে, তাই ভ্রমণের সময় বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।
অন্যদিকে মার্চ থেকে মে মাসের গ্রীষ্মকালে হিমছড়িতে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা তুলনামূলক বেশি থাকে। তবুও যারা এই সময়ে ভ্রমণ করতে চান, তারা সকাল বা বিকেলের দিকে গেলে অনেক বেশি স্বস্তিদায়ক পরিবেশ পাবেন। দুপুরের তীব্র রোদ এড়িয়ে চললে পাহাড়, সমুদ্র এবং আশপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আরামদায়কভাবে উপভোগ করা যায়।
হিমছড়ি ঝর্ণা ও পাহাড় দেখার টিকিট মূল্য
হিমছড়ি জাতীয় উদ্যান ও ঝর্ণা এলাকায় প্রবেশের জন্য দর্শনার্থীদের নির্ধারিত টিকিট সংগ্রহ করতে হয়। টিকিটের মাধ্যমে পর্যটকরা ঝর্ণা, পাহাড়ের ভিউ পয়েন্ট এবং ইকোপার্কের মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ উপভোগ করতে পারেন। স্থানীয় দর্শনার্থীদের জন্য টিকিট মূল্য সাধারণত ৩০-৪০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে, তবে সময়ভেদে এতে পরিবর্তন আসতে পারে।
বিদেশি পর্যটকদের জন্য প্রবেশমূল্য সাধারণত ১০০ টাকা। হিমছড়ি ইকোপার্ক প্রতিদিন সকাল ৮:০০টা থেকে বিকেল ৫:০০টা পর্যন্ত খোলা থাকে। পর্যটন মৌসুম, সরকারি ছুটি বা বিশেষ পরিস্থিতিতে টিকিট মূল্য ও সময়সূচিতে পরিবর্তন হতে পারে। বিকেলের দিকে আবহাওয়া তুলনামূলক আরামদায়ক থাকায় অনেক পর্যটক এ সময় ভ্রমণ করতে পছন্দ করেন।
নোট: টিকিটের মূল্য ও সময়সূচি সময়ে সময় পরিবর্তিত হতে পারে। তাই ভ্রমণের আগে সর্বশেষ তথ্য যাচাই করে নেওয়া ভালো।
যাবেন কিভাবে?
ঢাকা থেকে কক্সবাজার যাওয়ার উপায়
ঢাকা থেকে কক্সবাজারে বাস, ট্রেন অথবা বিমানে সহজেই যাতায়াত করা যায়। বাসে ভ্রমণ করতে চাইলে সায়দাবাদ, গাবতলী এবং মহাখালীসহ ঢাকার বিভিন্ন টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন অসংখ্য বাস কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। নন-এসি বাসের ভাড়া সাধারণত ৯০০ থেকে ১,৩০০ টাকার মধ্যে এবং এসি বাসের ভাড়া ১,০০০ থেকে ২,৬০০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। জনপ্রিয় বাস সার্ভিসগুলোর মধ্যে রয়েছে গ্রীন লাইন পরিবহন, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, শ্যামলী পরিবহন, সোহাগ পরিবহন, এস. আলম পরিবহন, সৌদিয়া, সেন্টমার্টিন পরিবহনসহ আরও বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। আপনার বাজেট ও সুবিধা অনুযায়ী যেকোনো বাস বেছে নিতে পারেন।
ট্রেনে যেতে চাইলে ঢাকা থেকে সরাসরি কক্সবাজারগামী ট্রেনে ভ্রমণ করা সবচেয়ে আরামদায়ক বিকল্পগুলোর একটি। বর্তমানে পর্যটক এক্সপ্রেস এবং কক্সবাজার এক্সপ্রেস ট্রেন নিয়মিত চলাচল করে। পর্যটক এক্সপ্রেস ভোর ৬:১৫ মিনিটে ঢাকা থেকে যাত্রা শুরু করে চট্টগ্রাম হয়ে বিকেল ২:৪০ মিনিটে কক্সবাজার পৌঁছে। অন্যদিকে কক্সবাজার এক্সপ্রেস রাত ১১:০০টায় ঢাকা ছাড়ে এবং পরদিন সকাল ৭:২০ মিনিটে কক্সবাজার পৌঁছায়। তবে ভ্রমণের আগে সর্বশেষ সময়সূচি যাচাই করে নেওয়া ভালো, কারণ সময় পরিবর্তিত হতে পারে।
যারা দ্রুত এবং আরামদায়ক ভ্রমণ করতে চান, তারা বিমানে কক্সবাজার যেতে পারেন। ঢাকা থেকে প্রতিদিন একাধিক ফ্লাইট কক্সবাজার রুটে চলাচল করে। সাধারণত বিমান ভাড়া ৬,৫০০ থেকে ৮,০০০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করে, যদিও মৌসুম ও টিকিটের প্রাপ্যতার ওপর ভাড়া কিছুটা কম-বেশি হতে পারে।
কক্সবাজার থেকে হিমছড়ি যাওয়ার উপায়
কক্সবাজার শহর বা কলাতলী মোড় থেকে হিমছড়ি যাওয়ার জন্য সবচেয়ে সহজ মাধ্যম হলো ইজিবাইক, সিএনজি অটোরিকশা কিংবা খোলা জীপ। সাধারণত মেরিন ড্রাইভ সড়ক দিয়ে হিমছড়ি পৌঁছাতে ২০ থেকে ৩০ মিনিট সময় লাগে। লোকাল ইজিবাইক বা সিএনজিতে গেলে জনপ্রতি ভাড়া ৫০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে। আর পরিবার বা বন্ধুদের নিয়ে আরামদায়কভাবে ঘুরতে চাইলে রিজার্ভ সিএনজি নিতে পারেন, যার ভাড়া সাধারণত ৪০০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে থাকে। তবে মৌসুম ও দরদামের ওপর ভাড়া কিছুটা কম-বেশি হতে পারে।
খরচ কমাতে চাইলে লোকাল পরিবহন ব্যবহার করা ভালো, তবে এতে নিজের ইচ্ছামতো পথে গাড়ি থামিয়ে ছবি তোলার সুযোগ কম থাকে। অন্যদিকে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত এলাকা থেকে নিয়মিত খোলা জীপ হিমছড়ির উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়, যা পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। এছাড়া রিকশায় যাওয়া-আসা করলে প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা এবং ব্যাটারিচালিত রিকশায় গেলে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। মেরিন ড্রাইভের মনোরম দৃশ্য উপভোগ করতে করতে হিমছড়ি পৌঁছানোর অভিজ্ঞতাটি ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ।
কোথায় থাকবেন?
হিমছড়ি ভ্রমণে গেলে থাকার জন্য কক্সবাজার শহরই সবচেয়ে সুবিধাজনক স্থান। বিশেষ করে কলাতলী, সুগন্ধা ও লাবনী বিচ এলাকার হোটেল, রিসোর্ট এবং কটেজগুলো পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। এখান থেকে সহজেই অটোরিকশা, সিএনজি কিংবা খোলা জীপে করে হিমছড়ি ও মেরিন ড্রাইভ ঘুরে আসা যায়। কক্সবাজারে বিভিন্ন বাজেটের অসংখ্য আবাসনের মধ্যে সায়মন বিচ রিসোর্ট, মারমেইড বিচ রিসোর্ট, ওশেন প্যারাডাইস, লং বিচ হোটেল, সি গাল, সি প্যালেস, সি ক্রাউন, কোরাল রিফসহ আরও অনেক পরিচিত হোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে। তবে মৌসুম ও ছুটির সময় অনুযায়ী কক্ষভাড়া কম-বেশি হতে পারে।
যারা প্রকৃতির আরও কাছাকাছি থাকতে চান, তারা হিমছড়ি ও মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন কিছু রিসোর্ট বা ইকো-কটেজ বেছে নিতে পারেন। এসব জায়গা থেকে একদিকে পাহাড় আর অন্যদিকে সমুদ্রের অপূর্ব দৃশ্য উপভোগ করা যায়। অন্যদিকে বাজেট ভ্রমণকারীদের জন্য কলাতলী রোড বা সমুদ্রসৈকত থেকে কিছুটা ভেতরের দিকে থাকা হোটেলগুলো ভালো বিকল্প হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে ৫০০ টাকা বা তার কাছাকাছি বাজেটেও থাকার ব্যবস্থা পাওয়া যায়। তাই নিজের বাজেট ও প্রয়োজন অনুযায়ী কক্সবাজার শহর কিংবা মেরিন ড্রাইভ এলাকার যেকোনো আবাসন বেছে নিতে পারেন।
খাবেন কি?
হিমছড়িতে ভ্রমণের সময় সাধারণত বাঙালি খাবার( ভাত-ডালভর্তা) এবং মূলত সামুদ্রিক মাছশুটকি ভালো পাওয়া যায়। এছাড়া পাহাড় ও সাগরের মনোরম পরিবেশে হালকা শুকনো খাবার বা মেরিন ড্রাইভের পাশের ক্যাফেগুলোতে স্ন্যাকস ও নাস্তা খাওয়ার জন্য সেরা।
পাহাড়ের নিচে ডাবের পানি সকল ক্লান্তি দূর করে। এখানে বিভিন্ন ধরনের তাজা সামুদ্রিক মাছের কারি ও ফ্রাই পাওয়া যায়। এছাড়া কক্সবাজারের বিখ্যাত শুটকি মাছ এবং বিভিন্ন পদের ভর্তা রয়েছে।
এছাড়া হিমছড়িতে আশেপাশের রেস্তোরাঁয় মাটির চুলায় রান্না করা হরেক রকমের ভর্তা-ভাজি ভাতের সাথে দারুন জমে।
হিমছড়ি থেকে অনায়াসেই ২-৪ ঘন্টায় ঘুরে আসা যায়। তাই চাইলে হালকা খাবার শুকনো কেক-বিস্কুট বা চিপস এবং মিনারেল ওয়াটার রাখা সুবিধাজনক। অথবা কক্সবাজারে ফিরে এসে খেতে পারেন।
মেরিন ড্রাইভের পাশে অবস্থিত এঞ্জেল ইকো রিসোর্ট এন্ড রেস্টুরেন্ট বা মারমেইড ক্যাফেডিভাইন সি স্টোন ক্যাফেতে খাবারের সুবিধা রয়েছে। অনেক দর্শনার্থী হিমছড়ি ও ইনানী ঘুরে পুনরায় কক্সবাজার
ফিরে আসে কারণ সেখানে খাবারের অনেক বেশি বিকল্প রয়েছে।
ঢাকা থেকে কক্সবাজার কত কিলো ?
ঢাকা থেকে কক্সবাজার যেতে কত সময় লাগে ?
ঢাকা থেকে কক্সবাজার যেতে বাসে সাধারণত ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা সময় লাগে। বাসে ঢাকা থেকে কক্সবাজার (প্রায় ৩৯০ কিমি) গিয়ে, সেখানে থেকে জীপে বা অটোরিকশা করে কলাতলী মোড় হতে ১০-১২ কিলোমিটার দূরের হিমছড়িতে পৌঁছতে হয়।
ঢাকা থেকে ব্যক্তিগত গাড়ি/ ভাড়া গাড়িতে যেতে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা সময় লাগবে। এছাড়া আকাশপথে ঢাকা থেকে কক্সবাজার যেতে সাধারণত ৫৫ মিনিট থেকে ১ঘন্টা ১৫ মিনিট সময় লাগে। এক্ষেত্রে সড়ক পথের দীর্ঘ যানজট এবং ভ্রমণের ক্লান্তি এড়িয়ে যাওয়া যায়।
কক্সবাজার থেকে হিমছড়ি কত কিলোমিটার ?
কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত বা মূল শহর থেকে হিমছড়ি ইকো পার্ক ও ঝর্ণার দূরত্ব প্রায় ১২ কিলোমিটার
কক্সবাজার (কলাতলী বা ডলফিন মোড় থেকে ) থেকে হিমছড়ি ভাড়া কত ?
ইজিরাইডার বা টমটম: ডলফিন মোড় থেকে হিমছড়ি পর্যন্ত লোকাল ভাড়া জনপ্রতি ৪০ থেকে ৫০ টাকা.
সিএনজি অটোরিকশা: লোকাল সিএনজিতে গেলে জনপ্রতি ভাড়া সাধারণত ৫০ থেকে ৭০ টাকা.
ছাদখোলা জিপ (চাঁদের গাড়ি): জিপে করে লোকাল গেলে জনপ্রতি ৭০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত নিতে পারে.
কলাতলী থেকে ইনানী কত কিলোমিটার?
কক্সবাজারের কলাতলী মোড় (ডলফিন মোড়) থেকে ইনানী বিচের দূরত্ব প্রায় ২৪ থেকে ২৫ কিলোমিটার মেরিন ড্রাইভ সড়ক ধরে হিমছড়ি পার হয়ে একটু সামনে গেলেই এই পাথুরে সৈকতে পৌঁছানো যায়.
Photo Credit : Siraj Akram Kayes

