শশীলজ ময়মনসিংহের কোথায় অবস্থিত?
শশী লজ, নামটা শুনলেই মনে একটা প্রশ্ন উঁকি দেয় তা হলো – এটি কোথায় অবস্থিত? হ্যাঁ ঠিক তাই, দেশের সপ্তম বৃহত্তম সিটি কর্পোরেশন ময়মনসিংহের জজকোর্ট এলাকার খুব কাছেই শশীলজ তথা ময়মনসিংহ রাজবাড়ির অবস্থান। ১৮৯৭ -এর ভূমিকম্পে এ ভবনের বেশিরভাগটাই ক্ষতিগ্রস্ত হলে সংস্কারের সময়সূচি অনুযায়ী ১৯০৫ সালে এটিকে নতুনরূপ দেওয়া হয়। প্রবেশ গেট পেরিয়েই আছে বাগান তারপর মূলভবনের সামনে আপনাকে স্বাগত জানাবে শ্বেত বেদিতে স্বল্পবসনা গ্রিক দেবী ভেনাসের মূর্তি।
শশীলজ অবস্থিত ব্রহ্মপুত্র নদের অদূরে ময়মনসিংহ মূল শহরের নতুন বাজার ট্রাফিক মোড় থেকে উত্তর দিকে ২/৩ মিনিটের পথ পেরিয়ে ঠিক হাতের ডানেই। ৯ একর জমির উপর অবস্থিত ছোট-বড় প্রায় ১৬টি গম্বুজ দ্বারা নির্মিত ১৬ কক্ষের নন্দনিক এ দ্বিতল ভবনের মূল দড়জার অবস্থান উত্তরমুখী। মূলত মুক্তাগাছার জমিদার সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী ছিলেন নিঃসন্তান এবং তার দত্তক পুত্র শশীকান্ত অযার্চ চৌধুরীর নামানুসারেই এই ভবনটির নামকরণ করা হয়। এটি ২০১৫ সাল থেকে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধীনে রয়েছে যা কি না যাদুঘর হিসেবেও প্রদর্শিত। ২০১৯ সাল থেকে এই রাজবাড়ির অন্দরমহল জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।
শশীলজের ইতিহাস কী ?
ময়মনসিংহ রাজবাড়ি খ্যাত শশীলজে প্রবেশ পথে আনিন্দ্যসুন্দর ফুলবাগান পেরিয়ে আপনার চোখে পরবে শ্বেত পাথরের ফোয়ারর মাঝে দাড়িয়ে থাকা ভেনাস মূর্তি। কীভাবে এলো এটি আর এর ইতিহাসই বা কী? রোমান পুরাণের দেবী ভেনাস। দেবী ভেনাসকে পুরাণ অনুযায়ী কিউপিডের মাতা হিসেবে জানা যায়। মাতৃসমা ভেনাস প্রেম ও সৌন্দর্যের দেবী হিসেবে পরিচিত। ১৯১১ সালে পুনঃনির্মিত এ ভবনের সৌন্দর্য বর্ধনের কাজে শশীকান্ত আচার্য তার সৌখিনতার নিদর্শন স্বরূপ এই ভেনাস মূর্তিটি স্থাপন করেন। আর সেই থেকে শতাব্দী কালের সাক্ষী হিসেবে মাথা উঁচু করে দাড়িয়ে আছে ইতাহাসের বিখ্যাত দেবী ভেনাস। কিন্তু ২০২৪-এর ছাত্র আন্দোলনে কতিপয় উগ্রবাদীর আক্রমণে এ মূর্তিটি ভেঙে ফেলা হয় ফলে এখন সেই স্থানে রয়েছে মূর্তিশূন্য ফাঁকা শ্বেত বেদি।
কোন সময়ে যাবেন ?
শতাব্দী কালের সাক্ষী হিসেবে ইতিহাসের নান্দনিক এ স্থানটি ঘুরতে যাবার ইচ্ছে কার না হয়। আর এখানে ভ্রমণের সঠিক সময় হিসেবে ডিসেম্বর থেকে মার্চ মাস হবে খুব উপযুক্ত। জমিদার শশীকান্তের সৌখিনতার নিদর্শন স্বরূপ এর নির্মানশৈলি ও পরিকাঠামোর পাশাপাশি প্রকৃতির নয়নাভিরাম ফুলবাগানের দৃশ্য অবলোকনে আপনাকে শীতের মৌসুমটাই বেছে নিতে হবে। পাশ্চাত্য রোমান সভ্যতার আদলে তৈরি এর বড় বড় কারুকার্যখচিত পিলারগুলো আপনার কল্পনার জগতকে এক অন্যরকম অনুভূতি দিবে। দিনের আলোর ফোটার সঙ্গে সঙ্গে ভবনের সৌন্দর্য যেন ঠিকরে বেড়িয়ে আসে, তাই এই ভ্রমণকেন্দ্রটি ঘুরে আসল নান্দনিক দর্শন পেতে শীতের শুরু থেকে গ্রীষ্মের শুরু পর্যন্ত সময়টা বেছে নিন।
যাবেন কীভাবে ?
ঢাকা থেকে শশীলজে যাবার জন্য আপনি বাস ও ট্রেন উভয় পথই বেছে নিতে পারেন।
বাসে যেতে চাইলে ঢাকা থেকে শশীলজের দূরত্ব হবে প্রায় ১১৫ কি. মি। সড়কে জ্যাম বা কোনো সমস্যা না থাকলে মোটামুটি আড়াই থেকে তিন ঘন্টার মধ্যেই আপনি পৌঁছে যেতে পারবেন। ভাড়া বাস ভেদে ননএসিতে জনপ্রতি ২০০-২৫০ টাকা। তারপর ময়মনসিংহ নগরের মাসাকান্দা বাসস্ট্যান্ডে নেমে ৩০/৪০ টাকা রিক্সা ভাড়ায় সরাসরি চলে যেতে পারবেন শশীলজে।
- সৌখিন পরিবহন ছাড়ে সকাল ৫:৩০ টা থেকে ( যোগাযোগ – ০১৭১৫-৯১০৮৭০)
- এশিয়ার প্রকৃতি পরিবহন ঢাকা থেকে ছাড়ে সকাল ৬ টা থেকে ( যোগাযোগ – ০১৭১৬-৯২৪৩০২)
- স্বপ্নভূমি ছাড়ে ভোর ৫:৩০ টা থেকে (যোগাযোগ – ০১৭১৫-৯১০৮৭০)
- এনা পরিবহন ছাড়ে সকাল ৮:৩০ টা থেকে ( যোগাযোগ – ০১৯২৪-৭৬৪৫৭১)
এছাড়াও আরও বাস পাবেন যেগুলো ঢাকা টু ময়মনসিংহ রুটে চলাচল করে থাকে।
ঢাকা থেকে ট্রেনে যেতে চাইলে সময় লাগতে পারে ৩-৪ ঘন্টা। ভাড়া আসনভেদে জনপ্রতি ১২০-৫০০ টাকা। রেলস্টেশন থেকে রিক্সায় ২০-২৫ টাকায় যেতে পারবেন আপনার কাঙ্খিত ভ্রমণস্পটে। ট্রেনগুলো –
- তিস্তা এক্সপ্রেস কমলাপুর থেকে ছাড়ে সকাল ৭:৩০ মিনিটে।
- বিজয় এক্সপ্রেস ছাড়ে সকাল ৯ টায়।
- অগ্নিবীণা এক্সপ্রেস কমলাপুর থেকে ছাড়ে সকাল ১১ টায়
শশী লজে প্রবেশের সময়সূচি ও টিকিট মূল্য
আপনি একজন ভ্রমণ পিপাসু হয়ে থাকলে এই ভ্রমণকেন্দ্রটিতে আসার পূর্বে সরকারি ছুটির তালিকাটি ভালোভাবে দেখে নিবেন। এই পিকনিক স্পটটি সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধীনে থাকায় এবং তার সঙ্গে এর একটি ভবন স্বাধীনতার পূর্ব থেকে শিক্ষম প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় সরকারি ছুটির দিনগুলোতে বন্ধ থাকে। তাছাড়া অন্য দিনগুলোতে এখানে প্রবেশে সাধারণের জন্য সকাল ১০ টা থেকে ৪টা পর্যন্ত খোলা রাখা হয়। মনে রাখবেন বিশেষ দিবসগুলেতে ভ্রমণবিলাসিদের চাপ থাকে বেশি তাই আগে আসার আসবার চেষ্টা করা ভালো। তাছাড়া এখানে টিকিট মূল্য জনপ্রতি ২০ টাকা এবং এই একটিকিটে ভিতরের সব অংশই ঘুরে দেখবার সুযোগ থাকে।
খাবেন কোথায় ?
শশীলজের অবস্থান শহরের কেন্দ্রে হওয়ায় খাওয়ার স্থান নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। ময়মনসিংহ শহরে বেশকিছু নামকরা রেস্তোরাঁ রয়েছে যেগুলোতে সহজেই খাবারের কাজটি সাড়া যায়। হোটেল মিনার, মা মনি, হোটেল খন্দকার, রোম থ্রি, ইয়াংকিং – এর মতো নামকরা সব রেস্তোরাঁয় হলকা নাস্তা থেকে ভাত, মাছ, মাংস, ডেজার্ট আইটেমসহ প্রায় সবই পাবেন। তবে রেস্তোরাঁ ভেদে খাবারের মূল্যে তারতম্য থাকতে পারে। তাই খাবারের পূর্বে পরিবেশ ও খাবার তালিকা অনুযায়ী মূল্য সম্পর্কে জেনে নেওয়া ভালো।
সতর্কতা
- সরকারি ভাবে অধিগ্রহণকৃত হওয়ায় এখানে বেআইনি কোনো কাজ করা যাবে না।
- কোনোরকম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা যাবে না।
- যাদুঘরে প্রদর্শিত কোনোকিছুতে হাত দেওয়া যাবে না এবং কোনোকিছুর ক্ষতিসাধন করা যাবে না
ছবিঃ উপমা কর

