ইতিহাস জানতে বা পুরোনো দিনগুলোর অতীত খুঁজতে যারা আগ্রহী তাদের জন্য ঢাকার কাছাকাছি রয়েছে মুন্সীগঞ্জের দর্শনীয় স্থান, ইদ্রাকপুর কেল্লা। ইদ্রাকপুর কেল্লা কোথায় অবস্থিত, কীভাবে যাবেন, বন্ধের দিন কবে সবকিছু জেনে নেবো একসাথে।
ইদ্রাকপুর কেল্লার ইতিহাস
১৬৬০ সাল। বাংলার শাসন তখন ছিলো মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের হাতে। সাম্রাজ্য রক্ষায় শাসকরা তখন সর্বদা ভীত। জলদস্যু যেনো ওত পেতে আছে চারিদিকে। ঠিক সেই সময় পর্তুগিজ ও মগ জলদস্যুদের আক্রমণ থেকে বাংলা রক্ষার উদ্দেশ্যে এই দুর্গ নির্মাণ করা হয়। এই দুর্গ নির্মাণ করেন বাংলার সুবেদার মীর জুমলা। ধারণা করা হয় ঢাকা ও তার পাশের এলাকাগুলোর নদীপথের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ছিলো এই দুর্গের মূল উদ্দেশ্য।
ইদ্রাকপুর কেল্লা কোথায় অবস্থিত ?
বর্তমান মুন্সীগঞ্জের পূর্বনাম ছিলো ইদ্রাকপুর। ইদ্রাকপুর কেল্লার অবস্থান মুন্সীগঞ্জ সদরে ইছামতী নদীর পশ্চিম পাশে। পুরানো কোর্ট অফিস সংলগ্ন এই পুরাকীর্তিটি সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় চারশো বছরের ইতিহাস বহনকারী হিসাবে। কেল্লার তিন কিলোমিটার সীমান্তে রয়েছে তিনটি নদী।
ইদ্রাকপুর কেল্লা দেখার সময়সূচী
বৃহস্পতিবার বিকাল ৪ টা থেকে শুক্রবার সারাদিন দুর্গটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। তবে বর্তমানে সংস্কারজনিত কাজের জন্য বন্ধ রয়েছে দুর্গটি। সাধারণত রবিবার পুরোদিন আর সোমবার অর্ধেকদিন বন্ধ থাকে দুর্গটি।
দুর্গের ভেতর যা রয়েছে
১৩ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা দুর্গটি চারপাশে বৃত্তাকার বেষ্টনী রয়েছে। দুর্গের মূল অংশে রয়েছে ৩৩ মি: ঊঁচু একটি মঞ্চ। শত্রুরর গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হতো এই মঞ্চটি। মঞ্চটি ঘিরে রেখেছে আরও একটি নিরাপত্তা বেষ্টনী যা মূল দেয়ালের সাথে এসে মিলেছে। প্রাচীর দেয়ালে রয়েছে চতুষ্কোণ আকৃতির অনেকগুলো ফোঁকর যা শত্রুর উদ্দেশ্যে গোলা নিক্ষেপের জন্য ব্যবহৃত হতো। একটি সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলে এই দুর্গের এক দরজার দেখা মেলে। দরজার ওপাশে রয়েছে গোলাকার মঞ্চ যেখান থেকে দৃষ্টি মেললে পুরোনো দৃশ্যগুলো যেনো কল্পনায় ভেসে ওঠে। দুর্গটি তৈরিতে যেসব ইট ব্যবহৃত হয়েছে তাদের আয়তন দৈর্ঘ্যে ৮২ মি: এবং প্রস্থে ৭২ মি:। সবকিছু দেখে এবং নথিপত্র ঘেটে এর গঠন সম্পর্কে জানা যায় এটি মুঘলদের জাদুকরী নকশায় খচিত আধুকিন এক গঠনশৈলী ছিলো। মূলত তিনটি ভাগে এই দুর্গটি সাজানো। দুর্গের ভেতর রয়েছে ছোট পরিসরে সাজানো এক জাদুঘর। তবে জাদুঘরটি খুব এক্টা সমৃদ্ধ না। জাদুঘর সাজানো হয়েছে অল্প কিছু বাঁধাই করা যুদ্ধের,যন্ত্রের ছবি দিয়ে। ৪০০ বছর পুরোনো এই পুরাকীর্তি এখন মোটামুটি অচল। পলেস্তার খসা, ইটের দেয়াল ধ্বসে পড়েছে, রংচটা জরাজীর্ণ এই জায়গাটি একসময় হাজার হাজার মানুষের জন্য ছিলো বড় এক রক্ষাকবচ। ভাবতেই যেনো অবাক লাগে! স্বাধীনতার পর দীর্ঘদিন এটি ডিসির বাসভবন হিসাবে ব্যাবহৃত হতো। ১৯০৯ সালে এই পুরাকীর্তিটি মুঘল সম্রাজ্যের ঐতিহাসিক প্রত্নতত্ত্ব হিসাবে তালিকাভুক্ত হয়। বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এর সংস্কারের কাজ হায়ে নিয়েছে।
এই দুর্গটি বর্তমানে এর জৌলুস হারিয়েছে। লোকমুখে প্রচলিত এই দুর্গ একসময় শুধু লালবাগের মতোন নগর রক্ষায় ই নয়,আরও গুরুত্বপূর্ণ কাজেও সেফগার্ড হিসাবে ব্যবহৃত হতো। যেমন- নদীপথে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী মসলিন থেকে শুরু করে কৃষিপণ্য পার্শিয়া, আরব কিংবা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় রপ্তানিতে যেসব নৌযান চলাচল করতো তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের পদ্ধতিতে ব্যাবহৃত হতো এই দুর্গ। কিছুদিন আগে পর্যন্তও পত্রিকা আর নিউজে এই পুরাকীর্তি নিয়ে আলোচনা হতো। বর্তমানে সংস্কারের কাজ চলায় এলাকাবাসী আর ইতিহাস সন্ধানকারীরা ব্যাপকভাবে উদগ্রীব হয়ে আছে এই দুর্গের গুরুত্ববহনকারী চেহারাটি আবারও এক পলক যদি দেখা যায় সে আশায়। বিশেষ করে ভেতরের জাদুঘরটি সমৃদ্ধ হবার আশায় আছে সবাই যাতে করে ঢাকার মতোন গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের রক্ষাকারী এই দুর্গ আর রক্ষাকর্তাদের গল্প আরও বেশি করে জানতে পারে মানুষ।
ঢাকা থেকে ইদ্রাকপুর কেল্লার দূরত্ব কতটুকু?
ঢাকার খুব কাছেই মুন্সীগঞ্জ জেলার অবস্থান। ঢাকা থেকে তাই কেল্লার দূরত্বও খুব বেশি নয়। ঢাকা থেকে এই কেল্লার দূরত্ব ৩৫-৪০ কি:মি: এর বেশি নয়।
যাবেন কীভাবে?
ঢাকা থেকে মাত্র তিন ঘন্টার রাস্তা মুন্সীগঞ্জ সদর। নিজস্ব বা ভাড়া করা গাড়িতে খুবই অল্প সময় এবং খরচে ঘুরে আসা যাবে এই কেল্লাটি। পাশাপাশি রয়েছে বাসে করে ঘুরে আসার ব্যবস্থা। ঢাকার সায়েদাবাদ, গুলিস্তান কিংবা মহানগর স্ট্যান্ড থেকে মুন্সীগঞ্জ সদরের উদ্দেশ্যে যেসব বাস ছেড়ে যায় (ঢাকা ট্রান্সপোর্ট, দিঘীরপাড় ট্রান্সপোর্ট) সেগুলোতে একশো টাকারও কম ভাড়ায় পৌঁছানো যায় মুন্সীগঞ্জ সদর। সদর থেকে রিকশা/অটোরিকশায় সরাসরি যাওয়া যায় ইদ্রাকপুর কেল্লা।

