ভাসমান পেয়ারা বাজার

ভাসমান পেয়ারা বাজার

ভাসমান পেয়ারা বাজার কোথায় অবস্থিত ? 

ধান, নদী, খাল – এই তিনে বরিশাল। প্রবাদটি সত্যিই বেশ অর্থবহ। বরিশাল জুড়ে বিভিন্ন স্থানে দেখা মেলে দিগন্ত বিস্তৃত ধানক্ষেত এবং বহমান বহু নদী ও খালের। তবে এই আর্টিকেলটি শুধুমাত্র বরিশালের কোন নদী বা খালকে ঘিরে সীমাবদ্ধ নয়। আজ আপনাদের জানাবো খালের উপর ভাসমান ভিন্নধর্মী এক বাজার সম্পর্কে। বরিশাল, ঝালকাঠি এবং পিরোজপুর জেলার সীমান্তবর্তী স্থানকে ঘিরে এই ভাসমান বাজারের অবস্থান। ঝালকাঠি শহর থেকে ১৫ কি:মি: দূরে ৩১,০০০ একর জায়গা নিয়ে পেয়ারার এই ভাসমান বাগান ও বাজার গড়ে উঠেছে প্রায় দুইশো বছর আগে।  বাজারটি ভিমরুলি ভাসমান বাজার বা ভাসমান পেয়ারা বাজার হিসেবে পরিচিত। এটি এশিয়া মহাদেশের সর্ববৃহৎ ভাসমান বাজার। 

যা দেখবেন পেয়ারা বাজারে

স্নিগ্ধতায় ঘেরা, অপার্থিব সবুজ এই স্বর্গের সৌন্দর্যকে দেশ বিদেশের পর্যটক, সাংবাদিক এবং ভ্লগাররা অধিকাংশ সময়েই তুলনা করেছেন থাইল্যান্ডের বা ভিয়েতনামের কিংবা ইতালির  ভেনিসের ভাসমান মার্কেটের সাথে। কখনও আবার আমাজন ফরেস্ট এর সাথে। দেশে উৎপাদিত পেয়ারার সিংহভাগ এই অঞ্চলেই উৎপন্ন হয়। বাজারটির নাম পেয়ারা বাজার হলেও এখানে কলা, পেঁপে,আমড়া, লেবু সহ অন্যান্য কিছু টাটকা ফলের দেখাও পাওয়া যায়। মূলত পুরো খালের দুই পাশ দিয়ে ছোট ছোট সবুজে ঘেরা অসংখ্য পেয়ারা বাগানে আচ্ছাদিত হওয়ার কারণেই ভিমরুলির এই পর্যটন কেন্দ্রটি পেয়ারা বাগান নামে পরিচিত। একশোরও বেশি নৌকায় করে প্রতিদিন টাটকা পেয়ারা  বহন এবং বিক্রয় করা হয়। কেনা এবং বেচা দুই ই চলে নৌকা থেকে নৌকায়। তিনটি খালের মোহনার মিলিত জায়গায় গড়ে ওঠা এই বাজারটির সবচে বেশি ব্যাস্ত সময় প্রতিদিন দুপুর বারোটা থেকে তিনটা। পেয়ারা বাগানগুলো খালের দুই পাশে কৃষকেরা নিজস্ব পরিকল্পনামতো এমনভাবে রোপণ করছেন যেনো নৌকায় করে সংগ্রহ ও পরিবহণে কোনো অসুবিধা না হয়। 

সবুজে আচ্ছাদিত দুই পাড়, তার মাঝ দিয়ে বয়ে চলা সরু খাল, খালের বুকে ভাসমান নৌকা এবং নৌকা ভর্তি পেয়ারার সৌন্দর্যমণ্ডিত দৃশ্য যে কারো মাঝে মুগ্ধতার আবেশ ছড়িয়ে দেয়। খালের একদম উত্তর পাশে রয়েছে কাঠের সেতু। সেখান থেকে এক নজরে আন্দাজ কষে নেওয়া যায় পুরো পেয়ারা বাজারটির। গরম হোক বা শীত, খালের উপর ঝুঁকে থাকা, উপচে পড়া সবুজ সবুজ পাহাড় আর নদীর নীল জলধারায় ছোট ছোট শ শ নৌকা আর উপরের খোলা আকাশ সব মিলিয়ে স্নিগ্ধ, মোহনীয় এক টুকরো সবুজের স্বর্গ সৃষ্টি করে নাগরিক সভ্যতার বাইরে এই এলাকাটি। তবে বিশেষত বর্ষাকালে স্থানটি অপরূপ সাঁজে সজ্জিত হয়। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি এখানের প্রাকৃতিক মাধুর্যকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। বর্ষার বৃষ্টিতে অনবরত ধুয়ে মুছে আরো গাঢ় হয়ে ওঠে প্রকৃতির মাধুর্য। 

গত কয়েক বছর ধরে দর্শনার্থীরা এই ধরণের টাটকা পেয়ারার ভাসমান বাজারের উদ্যোগকে আমাদের কৃষিপ্রধান দেশের কৃষির সংস্কৃতিকে সঠিকভাবে, গৌরবের সাথে ফুটিয়ে ওঠানোর একটি আকর্ষণীয়, অনবদ্য উপায় হিসাবে সাধুবাদ জানাচ্ছে। বর্তমানে বিশাল প্রচার ও প্রসারের ফলে ভিমরুলির এই জমজমাট জায়গাটি শুধু পেয়ারাচাষী ও তার পরিবারের রুটি রুজি বা ব্যাবসা নয় পর্যটনের একটি উৎকৃষ্ট উৎস হিসাবেও চিহ্নিত হয়েছে।  তো চলুন জেনে নেওয়া যাক ভিমরুলি ভাসমান বাজারে যাওয়ার উপায় এবং থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা সম্পর্কে।

যাওয়ার উপযুক্ত সময় 

আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে বাজার বেশি জমজমাট থাকে। তবে শুধু বাজার নয়, নৌকা বা ট্রলারে করে খালের বিভিন্ন স্থান ঘুরে পেয়ারা বাগান দেখার সুযোগও পেয়ে যাবেন এখানে। 

জুলাই,  আগস্ট বা সেপ্টেম্বরের শুরুর দিক এখানে ঘুরতে আসার জন্য উপযুক্ত সময়। মূলত প্রায় বিশ হাজার পরিবার এই বাগানের পেয়ারা চাষের সাথে যুক্ত। তাদের ভাষ্যমতে জুলাই এ পেয়ারা চাষ শুরু হয়। আর এসব টাটকা পেয়ারা নিয়ে সপ্তাহে সাতদিন সকাল- সন্ধ্যা পর্যন্ত বাজার বসে নৌকাতে। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পেয়ারার মূল মৌসুম। আর তাই জমজমাট  বেচাকেনার দৃশ্য ও তাজা, টাটকা পেয়ারার স্বাদ পেতে হলে অবশ্যই জুলাই এর শেষ থেকে সেপ্টেম্বর এর মাঝেই যেতে হবে। 

যাবেন কীভাবে

নদীপথঃ

সবচেয়ে সহজ হয় ঢাকার সদরঘাট থেকে ছেড়ে যাওয়া বরিশালগামী কোনো লঞ্চে চেপে বসলে। রাত নয়টার ভেতর সর্বশেষ লঞ্চ বরিশাল এর উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। লঞ্চ যেগুলো সরাসরি বরিশাল লঞ্চঘাটে গিয়ে থামে:

MV পরাবত- ২,৭,৯,১১

MV সুন্দরবন ৭ এবং ৮

MV মানামি

MV কামাল খান -১

MV সুরভী – ৭ এবং ৮

ভাড়া ডেক, সিংগেল কেবিন, ভি আই পি কেবিন ইত্যাদি ভেদে ৩০০ থেকে শুরু করে ১২০০, ১৮০০ এমনকি ১৫,০০০ পর্যন্ত রয়েছে। সন্ধ্যা ৬:০০ থেকে রাত নয়টার ভেতর যেকোন লঞ্চ ধরলে পরদিন সকালে বরিশাল পৌছে সেখান থেকে অটো রিকশা বা রিকশা ধরে চৌরাস্তা এবং সেখান থেকে বাসে স্বরূপকাঠি পৌঁছাতে হবে। স্বরূপকাঠিতে পাওয়া যায় ট্রলার যা ভাড়া নেয় ১০০০-১৫০০ টাকা এবং পৌঁছে দেয় ভিমরুলিতে। এখানে দরকষাকষির সুযোগ রয়েছে।

ঢাকা – হুলারহাট – ভান্ডারিয়া রুটের লঞ্চে ভ্রমণ ভাসমান পেয়ারা বাজারে যাওয়ার জন্য সুবিধাজনক। তবে অনেকদিন বন্ধ ছিলো এই রুটের লঞ্চ পরিবহণ। আগামী ৩০ মে ২০২৫ থেকে আবারো চালু হচ্ছে তিনটি লঞ্চ। লঞ্চগুলো হলো: MV Tipu – 12, Rajdut Prime এবং New Sunshine- 10। প্রতিদিন সন্ধ্যায় ঢাকা সদরঘাট থেকে হুলারহাটের উদ্দেশ্যে লঞ্চগুলো ছেড়ে যাবে।  লঞ্চ থেকে স্বরূপকাঠি ঘাটে নামতে হবে। সেখান থেকে ট্রলার ভাড়া করে ভিমরুলি বাজারে যেতে হবে। ট্রলারে যাওয়ার পথে আটঘর এবং কুরিয়ানাও ঘুরতে পারবেন। এখানেও  ট্রলার ভাড়া পড়বে ১০০০- ১৫০০ টাকার কাছাকাছি।

সড়কপথঃ

ঢাকার গাবতলী এবং সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ড থেকে ঝালকাঠির উদ্দেশ্যে বাস ছেড়ে যায়। ঈগল, সুরভী, সুগন্ধা, সাকুরা, শ্যামলী, গ্রীন লাইন, হানিফ, সোহাগ, এনা, দ্রুতি  -সহ বেশ কিছু অপারেটরের  এসি এবং নন এসি বাস এই রুটে চলাচল করে। এসব বাসের  মধ্যে নন এসি বাসগুলোর ভাড়া ৫০০-৬০০ এবং এসি বাসগুলোর  ভাড়া ৮০০-১২০০ টাকার মত। বাসগুলো যাত্রা শুরু করে সকাল ৫:৩০ থেকে এবং শেষ ট্রীপ রাত ৯:০০ পর্যন্ত হয়ে থাকে। বাস থেকে নামতে হবে  ঝালকাঠি সদরে। ঝালকাঠি থেকে বাইক এবং ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে ভাসমান বাজারে যাওয়া সম্ভব। ইঞ্জিনচালিত নৌকা ভাড়া করতে আপনাকে যেতে হবে ঝালকাঠি লঞ্চঘাটে। পুরোদিনের জন্য মাঝারি আকারের এসব ইঞ্জিনচালিত নৌকা ভাড়া করতে গুনতে হবে প্রায় ২০০০টাকা। 

খাবেন কোথায় 

পেয়ারা বাজারে গিয়ে পেয়ারা খাবেন এটা তো বেশ সুস্পষ্ট বিষয়। তবে শুধু পেয়ারা খেলেই তো আর চলবেনা। ভিমরুলি এবং কুড়িয়ানা বাজারে পেয়ে যাবেন বেশ কিছু মিষ্টির দোকান। সেখানের গরম মিষ্টি এবং সুস্বাদু সন্দেশ উপভোগ করতে পারেন। এছাড়া দুপুরের খাবারও সেরে নিতে পারবেন এখানের স্থানীয় কিছু হোটেলে। এগুলোর মধ্যে সকাল-সন্ধ্যা হোটেল বেশ জনপ্রিয়। এই হোটেলটি বৌদির হোটেল নামে পরিচিত। এখানের মাছ এবং ভাত বেশ বিখ্যাত। এছাড়া বরিশালের স্থানীয় খাবারের স্বাদ নিতে চাইলে ভালো মাধ্যম হবে খাবার বাড়ি নামক রেস্টুরেন্ট। আর দেশি খাবারের জন্য জনপ্রিয় চৌমাথার ভাই ভাই হোটেলটি।

থাকবেন কোথায়

 ভিমরুলিতে আবাসিক তেমন কোনো হোটেল না থাকায় রাত্রিযাপনের জন্য ঝালকাঠি আসতে হবে আপনাকে। তবে ভালো মানের হোটেল চাইলে আপনাকে বরিশাল পর্যন্ত যেতে হবে। নিচে ঝালকাঠি এবং বরিশালের কিছু রেস্ট হাউজ এবং হোটেলের তথ্য দেওয়া হলো

১) ধানসিঁড়ি রেস্টহাউজ

ঠিকানাঃ কালীবাড়ীরোড,ঝালকাঠি

নম্বরঃ ০১৯১১৯৬৯৪৩২

২) হোটেল হক ইন্টারন্যাশনাল

ঠিকানাঃ সদররোড, বরিশাল

নম্বরঃ০১৭৯২১৫১১৯১

৩) হোটেল এ্যাথেনা ইন্টারন্যাশনাল

ঠিকানাঃ কাটপট্টিরোড, বরিশাল

নম্বরঃ০১৭১২২৬১৬৩৩

৪) হোটেল গ্রান্ডপার্ক

ঠিকানাঃ বেল’স পার্ক, ব্যান্ড রোড বরিশাল

নম্বরঃ ০১৭৭৭৭৩৫১৭৩

৫) হোটেল সেডোনা

ঠিকানাঃ সদররোড, বরিশাল

নম্বরঃ ০১৭০৫২৯৩৮৭৮

৬) সার্কিট হাউজ

 ঠিকানা : জর্ডান রোড, বরিশাল

নম্বর : ০১৭৪৫১০১৩০২

আরো দেখবেন যা

পেয়ারা বাগান থেকে ১৩ কি:মি: দূরে কড়াপুর মিঞাবাড়ি ১৮ শতকের তৈরি লাল দুই তলা মসজিদ এবং অক্সফোর্ড মিশন চার্চ। 

দর্শনার্থীদের প্রতি নিবেদন

এই পেয়ারাবাগানের উপর আর্থিকভাবে নির্ভর করছে প্রায় বিশ হাজার পরিবার। দেড় হাজারের বেশি চাষী সরাসরি এই বেচাকেনার সাথে যুক্ত। রয়েছে অসংখ্য নৌকাচালকেরও আয় রোজগারের সুযোগ। আর তাই পর্যটনকেন্দ্র হয়ে ওঠা এই জায়গাটির যেনো পরিষ্কার পরিচ্ছিনতার বা পরিবেশগত কোনো ক্ষতিসাধন আমাদের দ্বারা না হয় তা খেয়াল রাখতে হবে সর্বোপরি। এছাড়া নিজেদের মনমতো দরকষাকষি করে তাদের যেনো আর্থিকভাবে কোনো ক্ষতি না হয় সেটাও মাথায় রেখে ভাড়া কিংবা পেয়ারার দাম নির্ধারণ করতে সহায়তা করতে হবে। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!