সোনারগাঁও জাদুঘর: ইতিহাস, অবস্থান, প্রবেশ মূল্য ও ভ্রমণ গাইড

Sonargao Jadughor

নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত দেশের অন্যতম লোকশিল্পের ধারক-বাহক সোনারগাঁও জাদুঘর। এর সরকারি নাম বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন। ঢাকা থেকে এর দূরত্ব প্রায় ২৫ কিলোমিটার। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে প্রায় ১ কিলোমিটার ভেতরে জাদুঘরটির অবস্থান।

সোনারগাঁও জাদুঘরে ঢুকলেই শহরের ব্যস্ত পরিবেশ থেকে আলাদা একটি আবহ চোখে পড়ে। সবুজের মধ্যে ছড়িয়ে থাকা স্থাপনা ও লোকজ নিদর্শন জায়গাটিকে ভ্রমণের জন্য আকর্ষণীয় করে তুলেছে। এই আর্টিকেলে জানব সোনারগাঁও জাদুঘর কোথায় অবস্থিত। জানব এর ইতিহাস। জানব জাদুঘরের ভেতরে কী কী দেখার আছে। এছাড়া জানব প্রবেশ মূল্য, সময়সূচি এবং ঢাকা থেকে সোনারগাঁও জাদুঘরে যাওয়ার সহজ উপায়।

সোনারগাঁও জাদুঘর কোথায় অবস্থিত?

সোনারগাঁও জাদুঘর নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও উপজেলায় অবস্থিত। এর ঠিকানা আমিনপুর, সোনারগাঁও, নারায়ণগঞ্জ। ঢাকা থেকে জাদুঘরটির দূরত্ব প্রায় ২৫ কিলোমিটার। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে প্রায় ১ কিলোমিটার ভেতরে জাদুঘরটি অবস্থিত।

সোনারগাঁওয়ের ঐতিহাসিক এলাকায় অবস্থান হওয়ায় জাদুঘরটি ঘুরতে গেলে আশপাশের কয়েকটি দর্শনীয় স্থানও দেখার সুযোগ রয়েছে।

সোনারগাঁও জাদুঘরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য

সোনারগাঁও জাদুঘরের ইতিহাস শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বাংলাদেশের লোকশিল্প ও কারুশিল্পকে সংগ্রহ ও সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে ১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠিত হয়। এর পেছনে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

ফাউন্ডেশনের মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশের লোক ও কারুশিল্প সংগ্রহ করা। এসব নিদর্শন সংরক্ষণ করাও ছিল অন্যতম লক্ষ্য। দর্শনার্থীদের সামনে এগুলো তুলে ধরাও এর একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। হারিয়ে যেতে বসা লোকশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করাও ফাউন্ডেশনের উদ্দেশ্যের মধ্যে রয়েছে।

১৯৯৬ সালের ১৯ অক্টোবর নতুন জাদুঘরটির নামকরণ করা হয় শিল্পাচার্য য়নুল লোক  কারুশিল্প জাদুঘর বর্তমানে এই জাদুঘর সোনারগাঁওয়ের অন্যতম প্রধান পর্যটন আকর্ষণ।

সোনারগাঁও জাদুঘরের স্থাপত্য  সংগ্রহ

সোনারগাঁও জাদুঘরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি হলো এর লোকজ পরিবেশ। এখানে ঢুকলে বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবন ও ঐতিহ্যের নানা নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায়।

জাদুঘরের সংগ্রহে রয়েছে জামদানি, মৃৎশিল্প, পোড়ামাটির ফলকচিত্র, নকশিকাঁথা, দারুশিল্প, বাঁশ ও বেতের কাজ, ধাতবশিল্প, লোকজ অলংকার এবং বাদ্যযন্ত্রসহ বিভিন্ন ধরনের লোককারুশিল্প। ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, তাদের সংগ্রহে মোট ৪,৮০৪টি নিদর্শন রয়েছে। এর মধ্যে ১,১২০টি নিদর্শন গ্যালারিতে প্রদর্শিত হচ্ছে।

জাদুঘরের গ্যালারিগুলোতেও বৈচিত্র্য দেখা যায়। কাঠখোদাইয়ের কাজ থেকে শুরু করে জামদানি, টেরাকোটা, নকশিকাঁথা, তামা-কাঁসা ও লোকজ অলংকারের বিভিন্ন নিদর্শন এখানে দেখতে পাওয়া যায়।

সোনারগাঁও জাদুঘরে কী কী দেখবন?

সোনারগাঁও জাদুঘর ঘুরতে গেলে নিচের জায়গা ও সংগ্রহগুলো দেখতে পারেন।

  • লোক  কারুশিল্পের গ্যালারি : বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্প ও কারুশিল্পের নিদর্শন দেখতে পাবেন।
  • জামদানি  নকশিকাঁথা : বাংলার ঐতিহ্যবাহী বস্ত্রশিল্পের বিভিন্ন নিদর্শন এখানে রয়েছে।
  • মৃৎশিল্প  পোড়ামাটির কাজ : পুরোনো দিনের মাটির তৈরি সামগ্রী ও পোড়ামাটির শিল্পকর্ম দেখতে পারবেন।
  • কাঠ  ধাতব কারুশিল্প : কাঠখোদাই, তামা-কাঁসা এবং অন্যান্য ধাতব সামগ্রীর বিভিন্ন নিদর্শন রয়েছে।
  • বড় সর্দারবাড়ি : জাদুঘর চত্বরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো ঐতিহাসিক বড় সর্দারবাড়ি। পুরোনো স্থাপত্য দেখতে চাইলে এটি অবশ্যই ঘুরে দেখার মতো।
  • কারুপল্লী : এখানে লোকজ কারুশিল্পের কাজ ও সংশ্লিষ্ট পরিবেশ দেখার সুযোগ রয়েছে।
  • লেক  সবুজ পরিবেশ: জাদুঘরের চারপাশের খোলা জায়গা ও লেক ভ্রমণকে আরও সুন্দর করে তোলে।

সোনারগাঁও জাদুঘরে কীভাবে যাবেন?

ঢাকা থেকে সোনারগাঁও জাদুঘরে যাওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো সড়কপথে যাওয়া। গুলিস্তান থেকে সোনারগাঁও বা মোগড়াপাড়া চৌরাস্তা যাওয়ার বাস পাওয়া যায়। মোগড়াপাড়া চৌরাস্তা থেকে রিকশা বা সিএনজি নিয়ে সরাসরি জাদুঘরে যেতে পারবেন। মোগড়াপাড়া থেকে জাদুঘরের দূরত্ব প্রায় ২ কিলোমিটার।

নিজস্ব গাড়ি নিয়ে গেলে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ব্যবহার করতে পারেন। মহাসড়ক থেকে সোনারগাঁওয়ের দিকে ঢুকলেই জাদুঘরের পথ পাওয়া যায়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মহাসড়ক থেকে ফাউন্ডেশনটি প্রায় ১ কিলোমিটার ভেতরে।

চাঁদপুর, কুমিল্লা বা দেশের পূর্বাঞ্চল থেকে এলে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ব্যবহার করেও সহজে সোনারগাঁও পৌঁছানো যায়। জাদুঘরের অবস্থান শহরের বাইরে হলেও যাতায়াতের ব্যবস্থা সহজ।

সোনারগাঁও জাদুঘর ভ্রমণের উপযুক্ত সময়

সোনারগাঁও জাদুঘর ঘুরতে শীতকাল বেশ আরামদায়ক। এই সময়ে রোদ তুলনামূলক কম থাকে। জাদুঘর চত্বরও স্বস্তিতে ঘুরে দেখা যায়।

তবে মেলা বা বিশেষ আয়োজনের সময় সোনারগাঁওয়ের পরিবেশ আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। ফাউন্ডেশনে লোককারুশিল্প মেলা, বৈশাখী মেলা এবং নবান্ন ও পৌষ মেলার মতো আয়োজনও হয়ে থাকে।

বর্তমান সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জাদুঘরটি এখন সপ্তাহের সাত দিনই খোলা রয়েছে। এই সিদ্ধান্ত পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কার্যকর।

সোনারগাঁও জাদুঘরের টিকেট মূল্য ও সময়সূচি

২০২৬ সালের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশি দর্শনার্থীদের জন্য প্রধান গেটের প্রবেশ মূল্য ৫০ টাকা। বিদেশি দর্শনার্থীদের জন্য এই মূল্য ১০০ টাকা। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সফরের ক্ষেত্রে প্রবেশ মূল্য ৩০ টাকা। চার বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য প্রবেশ ফি নেই।

ঐতিহাসিক বড় সর্দারবাড়ি দেখতে আলাদা টিকিট লাগে। বাংলাদেশি দর্শনার্থীদের জন্য এর মূল্য ১০০ টাকা। বিদেশি দর্শনার্থীদের জন্য মূল্য ২০০ টাকা। বড় সর্দারবাড়ির ভেতরে পরিদর্শনের সময় ৩০ মিনিট নির্ধারিত।

সাপ্তাহিক ছুটির ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারি তথ্য অনুযায়ী বৃহস্পতিবার জাদুঘর বন্ধ থাকার কথা উল্লেখ আছে। সময়সূচি ঋতুভেদে পরিবর্তিত হতে পারে। সরকারি তথ্যে শীতকালীন সময়ে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত পরিদর্শনের সময় উল্লেখ করা হয়েছে। যাওয়ার আগে সর্বশেষ সময়সূচি দেখে নেওয়া ভালো।

এই পোস্টটি কেমন লেগেছে?

রেটিং দিতে নিচের স্টারগুলোতে ক্লিক করুন।

Average rating 0 / 5. Vote count: 0

এখনও কোনো রেটিং পড়েনি। আপনিই প্রথম রেটিং দিন।

আপনার মন্তব্য লিখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!