নাগরিক জীবন আর মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পেতে ভ্রমণের কোনো বিকল্প নেই। ভ্রমণকালে ট্রাভেল ব্যাগটা কিন্তু আপনার সঙ্গী হয়েই বয়ে চলে দূর থেকে দূরান্তে। অথবা ট্রাভেল ব্যাগ হচ্ছে আপনার একমুঠো সংসার। জামাকাপড় থেকে শুরু করে ক্যামেরা, আনুষঙ্গিক টুকিটাকি আর প্রয়োজনীয় সকল জিনিসপত্রই আপনার জন্য সংরক্ষণে রাখে ট্রাভেল ব্যাগ (Travel Bag)।
ভ্রমণটাকে আরো আকর্ষণীয় আর উপভোগ্য করে তুলতে তাই ট্রাভেল ব্যাগের গুরুত্ব অনেক। দীর্ঘ হোক বা ছোটখাটো ট্যুর – ভ্রমণের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হচ্ছে এই ট্রাভেল ব্যাগ। তাই, ভ্রমণে যাবার আগে সঠিক ব্যাগ বাছাই করাটা অত্যন্ত জরুরী। সঠিক ব্যাগ বাছাই করার পূর্বে আরো কিছু বিষয়ের প্রতি নজর রাখা উচিত। আজকের আয়োজনটাই ভ্রমণের অনুষঙ্গী ট্রাভেল ব্যাগের রকমারি আর দরদাম নিয়ে।
কেনার আগে যা জানা জরুরী!
ভ্রমণে সঙ্গে ব্যাগ নিয়ে যাওয়া যেন নিজের ঘরটাকেই ছোট পরিসরে সঙ্গে করে নেয়ারই সমতুল্য। জামাকাপড়, জুতো, ক্যামেরা, ওষুধপত্রসহ আরো অনেককিছু ব্যাগে আঁটে যা আমাদের নিত্যদিনের প্রয়োজনীয়। তাই, ভ্রমণে ব্যাগের গুরুত্ব যে অপরিসীম তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু এই ব্যাগটাই যদি আরামদায়ক বা মনের মতো না হয় তাহলে তো ভ্রমনের আনন্দটাই মাটি হবার কথা। তাই ব্যাগ কেনার ক্ষেত্রে কিছু বিষয় মাথায় রাখা অতীব জরুরী। যেমন
- প্রথমেই ব্যাগের আকার নির্বাচন করতে হবে। পরিবারের সঙ্গে যাচ্ছেন নাকি একা যাচ্ছেন – তার উপর ব্যাগের আকার নির্ধারণ করে। পরিবারের সঙ্গে গেলে একটু বড় আর সহজে বহনযোগ্য ব্যাগ নেয়াই উত্তম। আবার একা ভ্রমণে বের হলে ব্যাকপ্যাক বা ডাফল ব্যাগই উপযুক্ত।
- যেই ট্রাভেল ব্যাগটিই নিতে চান না কেন, ব্যাগটি ওয়াটার প্রুফ বা পানি প্রতিরোধক কিনা তা জেনে এবং দেখে নিন। কারণ, পরিবেশ আর পরিস্থিতির কথা আগাম বলা যায় না। কিন্তু অগ্রীম ব্যবস্থা তো নেয়াই যায়। প্যারাসুট কাপড়ের ব্যাগগুলো এক্ষেত্রে ভালো। এছাড়াও, প্লাস্টিক, জিন্স, লিনেন, ম্যাক্স এবং লেদারের ব্যাগগুলোও বেশ কার্যকরী।
- ব্যাগের চেইন, লকার এবং ট্রলির হাতল এবং চাকাগুলো ঠিকঠাক আছে কিনা দেখা নেয়া অত্যন্ত জরুরী। নতুবা নতুন ব্যাগ নিয়ে ভ্রমণে গিয়ে বিপাকে পড়তে পারেন। ট্রাভেল ব্যাগের ক্ষেত্রে মোটা চেইনের ব্যাগ বেশ ভালো এবং টেকসই হয়। লকারগুলো ঠিকঠাক মতো কাজ করে কিনা সেটাও দেখে নেয়া জরুরী। ট্রলি ব্যাগের ক্ষেত্রে স্টিলের হাতল মজবুত হলে প্লাস্টিকেরগুলো এতটাও মন্দ নয়। আবার লোহার চাকা লাগানো এবং ব্যাগের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত চাকাওয়ালা ব্যাগগুলো টেকে বেশিদিন।
ব্যাগের রকমফের
বাজার ঘুরলেই হরেক রকমের আর অনেক ব্র্যান্ডের ব্যাগ নজরে পড়বে। একেক ব্যাগ একেকভাবে ব্যবহারযোগ্য করেই তৈরি করে থাকে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো। আবার, ট্রাভেলের ব্যাগটা একটু ফ্যাশনেবল না হলেই নয়। তাই, অগ্রীম জানা না থাকলে পড়তে পারেন বিভ্রান্তিতে। চলুন, রকমফের ভেদে ব্যাগের বিস্তারিত, দরদাম আর প্রাপ্তিস্থান সম্পর্কে জেনে নেই।
হ্যাভারস্যাক: ছোট ও সহজে পরিবহনযোগ্য এবং একইসঙ্গে দাম কম হওয়াতে হ্যাভারস্যাক ব্যাগগুলো বর্তমানে বেশ জনপ্রিয়। দেশি আর চায়না দু ধরনের পন্যই বাজারে পাওয়া যায়। মাঝারি আকারে হ্যাভারস্যাকও আছে বাজারে; যার মধ্যে প্রেসিডেন্ট এবং স্যামসোনাইটের ব্যাগগুলো প্রসিদ্ধ। অবশ্য ম্যাক্স আর পোলোর ব্যাগগুলোও কম প্রচলিত নয়। এই ধরনের ব্যাগগুলোতে অসংখ্য পকেট থাকে যা প্রয়োজনীয় টুকিটাকি জিনিস রাখতে সাহায্য করে।
র্যাকস্যাক বা ব্যাকপ্যাক: একদিন বা সর্বোচ্চ দুইদিনের ট্যুরে গেলে র্যাকস্যাক ব্যবহার করাটাই উপযুক্ত। কেননা, আকারে ছোট আর সহজেই বহনযোগ্য তাই সোলো ট্রাভেলারদের প্রথম পছন্দ র্যাকস্যাক। তবে কয়েকদিনের ট্যুরে গেলে র্যাকস্যাক তেমন একটা কাজে আসে না। সেক্ষেত্রে ব্যাকপ্যাকটাই উপযুক্ত। জামাকাপড় থেকে শুরু করে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও সহজে এঁটে যায়।
ডাফল বা রোলিং ব্যাগ: অনেকেই হাতে ঝুলন্ত ব্যাগ নিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। তাদের জন্য ডাফল বা রোলিং ব্যাগ বেশ উপকারী। হাতে ঝোলানো এসব ব্যাগ ১৮ ইঞ্চি অবধি লম্বা হয়ে থাকে। ফ্যাশনেবল এসব ডাফল বা রোলিং ব্যাগগুলো একইসঙ্গে কাঁধে এবং হাতে ঝোলানোর মতো করেই ইদানীংকালে তৈরি করা হয়ে থাকে।
ট্রাভেল ব্যাগ: বাজারে হরেক রঙের আর ঢঙের ট্রাভেল ব্যাগ পাওয়া যায়। যেমন – কাপড়ের তৈরি স্টাইলিশ ব্যাগ, চেম্বার ছাড়া অথবা চেম্বার সহ ট্রাভেল ব্যাগ, লেদারের ট্রাভেল ব্যাগ এবং মাল্টিপারপাস ট্রাভেল ব্যাগ ইত্যাদি। সাম্প্রতিককালে তো পাটের ব্যাগও তৈরি হচ্ছে।
ট্রাভেল ট্রলি: ট্রাভেল ট্রলি ব্যাগগুলো বিভিন্ন মাপের হয়ে থাকে। যেমন – ১৮ ইঞ্চি থেকে শুরু করে ২৬ কিংবা তারও বেশি হয়ে থাকে। আবার চাকাও দুটোর জায়গায় অনেকটা চারটা থাকে।
ট্র্যাভেল ব্যাগের দরদাম
ভ্রমণের মৌসুম এলে ট্রাভেল ব্যাগের চাহিদা বেড়ে যায় ভ্রমণপিপাসু মানুষদের কাছে। আর তখন বাজারও থাকে চাঙ্গা। সাধারণত রাজধানীর নিউমার্কেট, বাইতুল মোকাররম মসজিদ মার্কেট এবং বঙ্গবাজার এলাকা ব্যাগের জন্য এমনিতেই প্রসিদ্ধ। এছাড়া, রাজধানীর যমুনা ফিউচার পার্ক, বসুন্ধরা সিটি শপিং মল, আজিজ সুপার মার্কেটসহ বিভিন্ন শপিং মল আর মার্কেটগুলোতেই ব্যাগের দোকান রয়েছে।
দেশি ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে আছে ব্যাকপ্যাকার্স, জুরেক্স এবং ফোর ডাইমেনশন। আর বিদেশি ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে – প্রেসিডেন্ট, ক্যামেল মাউন্টেন, স্কাই ব্যাগার্স, উইলসন, ব্ল্যাক ডায়মন্ড, ম্যাক্স, পোলো এবং টিডল ব্র্যান্ড অন্যতম। অনলাইনে দারাজ, অথবা, পিকাবু, ব্যাগডুমসহ আরো অনেক ই-কমার্স সাইটেই ব্যাগের বিপুল সমাহার রয়েছে।
দেশি এবং চায়না হ্যাভারস্যাক ব্যাগগুলো ১০০০/১২০০ থেকে শুরু ১৮০০ থেকে ২/২২০০ টাকার মধ্যেই পাওয়া যাবে। তবে নামীদামী ব্র্যান্ডের ক্ষেত্রে তা ৪ হাজার থেকে প্রায় লাখের কৌটায়ও পৌঁছে যেতে পারে। র্যাকস্যাকগুলো সাধারণত ৫/৬০০ টাকা থেকে শুরু করে ১৫০০ বা ২ হাজারের মধ্যেই পাওয়া যাবে। ক্যামেল মাউন্টেন, উইলসন এবং পাওয়ারের ব্যাগগুলো ১ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ২৫০০ টাকার মধ্যেই। আবার, দেশি ব্র্যান্ড ফোর ডাইমেনশনের ব্যাগগুলো ১ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকার মধ্যে।
স্পেশাল ব্ল্যাক ডায়মন্ডের ব্যাগগুলো ৯ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা অবধি। প্রেসিডেন্টের হ্যাপার ব্যাগগুলো ১২০০ টাকা থেকে ২৫০০ টাকার মধ্যে। ট্রাভেল ব্যাগগুলো ১৫০০ থেকে ২২০০ টাকার মধ্যেই পাওয়া যায়। লেদারের ব্যাগগুলো আবার ৩৫০০ টাকা থেকে শুরু করে ৬ হাজার টাকা অবধি। পাটের ব্যাকপ্যাকগুলো ৮০০ টাকা থেকে শুরু করে ২৫০০ টাকা অবধি। ট্রলির দাম পড়বে ২৫০০ টাকা থেকে সাড়ে ৬ হাজার অবধি।
আনুষঙ্গিক বিষয়াবলী
- ব্যাগ কিনলেই হবে না। বরং প্রতিনিয়ত ব্যাগের পরিচর্যা বা যত্ন করতে হবে। নাহয় চেইনে জং পড়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে। সময়ে সময়ে বের করে চেইনে তেল দিয়ে এবং ঝেড়ে ব্যাগ পরিষ্কার করে রাখা উচিত।
- ছোট ছোট অনেকগুলো ব্যাগ ব্যবহার করার চাইতে বড় একটা ব্যাগ ব্যবহার করাই উত্তম। অনেকগুলো ব্যাগ হলে হারিয়ে যাবার সম্ভাবনাও তৈরি হয়।
- বুঝে শুনে ব্যাগে কাপড়চোপড় এবং জিনিসপাতি নিবেন। অহেতুক কোনো কিছু নিয়ে ব্যাগ ভর্তি করার প্রয়োজন নেই।

