বরিশালের গুটিয়া মসজিদ কোথায় অবস্থিত ?
বরিশালের এমন দর্শনীয় কিছু মসজিদ রয়েছে যা তার অসাধারণ নির্মাণশৈলীর কারণে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। বরিশাল জেলার উজিরপুর উপজেলার গুটিয়ার চাংগুরিয়া গ্রামে অবস্থিত গুটিয়া মসজিদটি। দৃষ্টিনন্দন এই মসজিদটি দক্ষিণাঞ্চল তো বটেই, সমগ্র বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ মসজিদ হিসাবে পরিচিত। এমনকি দক্ষিন এশিয়ার সবচেয়ে বড় মসজিদগুলোর মাঝে এটি একটি। মসজিদটির অপর নাম বাইতুল আমান জামে মসজিদ।
গুটিয়া মসজিদের ইতিহাস
চাংগুয়ার গ্রামেরই বাসিন্দা বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্ব এস. সরফুদ্দিন আহম্মেদ এই মসজিদটি নিজ বাড়ির সামনে প্রায় ১৪ একর জমির উপর নির্মাণ করেন। ২০০৩ সালে মসজিদটির নির্মাণ কাজ শুরু করা হয় এবং ২০০৬ সালে এর কাজ সমাপ্ত হয়। এই বিশাল স্থাপনাটি নির্মাণে ২ লাখের বেশি শ্রমিক নিযুক্ত ছিলেন। আধুনিক ঘরণার এই স্থাপনাটি তৈরি করতে খরচ হয়েছিলো ২০ কোটি টাকা। এখানের ঈদগাহ ময়দানটির ধারণক্ষমতা ২০ হাজারের কাছাকাছি। ২০০৬ সালে ঈদগাহ কমপ্লেক্স নির্মাণের পর থেকে এই ঈদগাহে ছয় সাত হাজারের বেশি লোকের জমায়েতে ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হয় এখনও। প্রতি শুক্রবারে জুম্মার নামাজও অনুষ্ঠিত হয় নিয়মিত। এই মসজিদে একসাথে প্রায় ১৪০০-১৫০০ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন।
মসজিদের ভিতরে দেখার কি কি আছে ?
ঈদগাহ ময়দানের প্রবেশপথে দুই ধারে দুটি সুন্দর ফোয়ারা রয়েছে। বিশাল এই মসজিদের ভেতরে রয়েছে পুকুর, লেক, রং বেরং এর ফুলের বাগান,গাড়ি পার্কিং এর ব্যাবস্থা, মাদ্রাসা, এতিমখানা, বড় বড় আলোকবাতি এমনকি হেলিপ্যাডও।এখানে একটি এতিমখানা এবং একটি ডাকবাংলোও রয়েছে। আরও আছে খতিব, মুয়াজ্জিনের বাসস্থান এবং একটি কবরস্থান। মসজিদের ভেতরের পবিত্রতাকে আরো ফুটিয়ে তুলতে প্রায় প্রতি দেয়ালে রয়েছে আরবী নানান আয়াত সম্বলিত ক্যালিগ্রাফি। সূরা আর রহমানের আয়াতও ক্যালিগ্রাফিতে দৃশ্যমান রয়েছে।
মসজিদটির অন্যতম আকর্ষণ হলো এর মিনার, যার উচ্চতা প্রায় ১৯৩ ফুট। মূল কাঠামোতে ৭ টি এবং ছোট বড় মোট ১৩ টি গম্বুজ নিয়ে এই মসজিদের গম্বুজ সংখ্যা ২০টি। মসজিদটির নির্মাণশৈলী বেশ বিচিত্র ও নান্দনিক। মূল মসজিদে প্রবেশের পর উপরের দেওয়াল বা সিলিং এর যে নকশা চোখে পড়ে তাতে মালোয়েশি বা তুর্কির মসজিদগুলোর নকশার ধরণ লক্ষ্য করা যায়।
মসজিদের বিভিন্ন স্থানেই এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের মসজিদগুলোর ছোঁয়া রয়েছে। ভেতরে প্রতিটি গম্বুজে আছে চোখ ধাধানো সুন্দর ঝাড়বাতি যেগুলো সবই মদিণা থেকে সংগ্রহকৃত। রাতের বেলা মসজিদটি অপরূপ আলোকসজ্জায় সজ্জিত হয়। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর হাজার আলোকবাতি জ্বলে ওঠে মসজিদ প্রাঙ্গণে যা নি:সন্দেহে পাল্লা দেয় দিনের রূপটির সাথে ।
আর ঠিক মসজিদের সামনেই যে বড় পুকুর তাতে পুরো মসজিদের চিত্র জ্বলজ্বল করে ভাসতে থাকে রাতে। নানা রঙ এর আলো আধারির খেলাতে মনে হয় পানির উপরেই দাঁড়িয়ে আছে এই বিশাল মিনারসহ মসজিদটি। মসজিদ প্রাঙ্গণের ভেতরে আছে একটি পুকুর ও বাগান। পুকুরের সাথেই আছে বসার জন্য বাঁধানো স্থান। পুকুরের ওপরে ছায়ার চাদর বিছিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি কাঠবাদাম গাছ।
সুপরিকল্পিতভাবে বিস্তৃত এবং সাদা, গোলাপি, ফিরোজা, হলুদ, বেগুনী এরকম বিভিন্ন রঙ এর মিশেল, সাদা মার্বেল পাথরের টাইলসে তৈরি চকচকে মেঝে, উন্নতমানের কাচের ব্যবহার এই মসজিদকে করেছে দৃষ্টিনন্দন, আকর্ষণীয়,এবং মনোমুগ্ধকর যা সচারচর বাংলাদেশের অন্যান্য মসজিদগুলোতে দেখা যায়না।
এই মসজিদে দর্শনার্থীদের জন্য বিভিন্ন পবিত্র স্থানের মাটি সংরক্ষণ এবং প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রিয় নবীজি হজরত মুহাম্মদ (সা:) এর জন্মস্থানের মাটি, পবিত্র কাবা শরীফের মাটি, আরাফার ময়দান, মা হাওয়ার কবরস্থানের মাটি, জমজম কূপের পানি সংরক্ষিত আছে এই মসজিদে। হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহ:) এর নিজ হাতে লেখে তাবীজ সংরক্ষন করা রয়েছে এই পবিত্র ঘরটিতে। পুরুষের পাশাপাশি মহিলাদের জন্যও নামাজ পড়ার সুব্যবস্থা রয়েছে এখানে।
প্রতিদিন বহু মানুষ মসজিদটির সৌন্দর্য উপভোগ এবং এখানে নামাজ আদায়ের জন্য আসেন। আর তাই মসজিদের দেখাশুনা, নিরাপত্তা, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ও রক্ষণাবেক্ষণে সার্বক্ষণিক নিয়োজিত রয়েছেন যথেষ্ট পরিমাণ কর্মচারী। ফলে প্রতিটা ইটে, দেয়ালে রয়েছে পরিচর্যার ছাপ। এই মসজিদের অন্যতম একটি দিক হলো এখানের কবরস্থানে রয়েছে অসহায় ও সম্বলহীন লোকদের বিনামূল্যে দাফনের ব্যাবস্থা। জানা যায় মসজিদটির দক্ষিণ পাশে রয়েছে মালিকের নিজস্ব ফিলিং স্টেশন যার আয় থেকে এই মসজিদের অধিকাংশ রক্ষণাবেক্ষণ খরচ পরিচালিত হয়।
তো চলুন জেনে নেওয়া যাক গুটিয়া মসজিদ যাওয়ার উপায় এবং বরিশালে থাকা-খাওয়া সম্পর্কে।
আরও যা দেখবেন
গুটিয়া মসজিদের অদূরে রয়েছে বাংলার আযহার খ্যাত ছারছীনা দারুসসুন্নাত জামেয়া-ই-ইসলামিয়া মাদ্রাসা, যা বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন একটি মাদ্রাসা। এছাড়া এক ভ্রমণেই দেখে আসা যেতে পারে শের ই বাংলা একে ফজলুল হকের বাড়ি, যাদুঘর এবনহ বিশাল দুর্গাসাগর দীঘি।
যাবেন কীভাবে ?
ঢাকা থেকে বরিশাল
নদীপথঃ
প্রতিদিন ঢাকা সদরঘাট থেকে বরিশাল রুটের লঞ্চগুলো রাত ৯টার মধ্যে ছেড়ে যায়। এসব লঞ্চের ডেক ভাড়া ২০০ টাকা থেকে শুরু হয়ে কেবিন এবং ভি আই পি কেবিন ভেদে ভাড়া ৩৫০০ এবং ৮০০০ পর্যন্ত হয়ে থাকে।
এ রুটের লঞ্চগুলো হলো MV মনামী, MV Tipu -12, MV Sundarbans-2, কুয়াকাটা- ২। সাধারণত লঞ্চগুলো ভোর ৫টার মধ্যে বরিশাল লঞ্চঘাটে পৌঁছে যায়।
সড়কপথঃ
ঢাকার গাবতলী, সায়েদাবাদ এবং কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে ভোর ৬টা হতে রাত ১০টা পর্যন্ত প্রতি ঘন্টায় বরিশালের উদ্দেশ্যে বাস ছেড়ে যায়। ঈগল, হানিফ, সাকুরা, গ্রীন লাইন, শ্যামলী, সৌদিয়া -সহ বেশ কিছু অপারেটরের বাস এই রুটে চলাচল করে। নন-এসি বাসের ভাড়া ৭০০ টাকা এবং এসি বাসের ভাড়া ১৫০০ টাকা। এগুলো ছাড়া কিছু লোকাল বাস ও রয়েছে যেগুলোর ভাড়া জনপ্রতি লাগে ২৫০-৩০০ টাকা তবে সেগুলো সময়সাপেক্ষ।
বরিশাল থেকে গুটিয়া মসজিদ
গুটিয়া মসজিদটির অবস্থান বরিশালের উজিরপুর উপজেলার গুটিয়া ইউনিয়নের চাংগুরিয়া গ্রামে। বরিশাল শহর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ১১ কিলোমিটার। যেতে হয় বরিশাল – বানারীপাড়া সড়ক ধরে। মূলত বরিশাল শহর থেকে অটোরিক্সায় বা রিকশায় করে গুটিয়া মসজিদে যাওয়া যায় সহজে। ভাড়াও নামমাত্র। এছাড়া বরিশাল হতে স্বরূপকাঠি যাবার বাসগুলোতে করেও গুটিয়া মসজিদে যাওয়া সম্ভব।
খাবেন কোথায় ?
খাবারদাবার বরিশাল শহরে সেরে নেওয়াই ভালো। বরিশালের খাবার হোটেলগুলোতে বিভিন্ন সুস্বাদু সামুদ্রিক ও মিঠা পানির মাছ পেয়ে যাবেন। পাশাপাশি মাংস, সবজিসহ অন্যান্য আইটেম তো আছেই। এছাড়া বরিশালের রসের মিষ্টি, বিখ্যাত সন্দেশ, স্থানীয় পিঠা উপভোগ করতে ভুলবেন না।
থাকবেন কোথায়
থাকার জন্য ভালো হোটেল চাইলে আপনাকে বরিশাল শহরের কোনো হোটেলেই থাকতে হবে। নিম্নে বরিশালের কয়েকটি উন্নতমানের হোটেলের তথ্য দেওয়া হলো –
- হোটেল হক ইন্টারন্যাশনাল
ঠিকানাঃ সদর রোড, বরিশাল
মোবাইল নম্বরঃ ০১৭৯২১৫১১৯১
- হোটেল সেডোনা
ঠিকানাঃ সদর রোড, বরিশাল
মোবাইল নম্বরঃ ০১৭০৫২৯৩৮৭৮
- হোটেল এ্যাথেনা ইন্টারন্যাশনাল
ঠিকানাঃ কাটপট্টি রোড, বরিশাল
মোবাইল নম্বরঃ ০১৭১২২৬১৬৩৩
- সার্কিট হাউজ
ঠিকানাঃ জর্ডান রোড, বরিশাল
মোবাইল নম্বরঃ ০১৭৪৩১০১৩২০
- ধানসিঁড়ি রেস্ট হাউজ
মোবাইল নম্বরঃ ০১৯১১৯৬৯৪৩২
এছাড়া যদি রাতের গুটিয়া মসজিদ ঘুরে দেখতে চান এবং বরিশাল ফেরা একান্তই সম্ভব না হয় সেক্ষেত্রে উজিরপুরের হোটেল আলী, হোটেল ইম্পেরিয়াল ইত্যাদি আবাসিক হোটেলে রাত্রিযাপন করতে পারেন। রুম বুক করার পূর্বে অবশ্যই একবার দেখে নেওয়ার পরামর্শ রইলো।
আশেপাশের অন্যান্য দর্শনীয় স্থানসমূহ
- দূর্গাসাগর
- সাতলা বিল
- বঙ্গবন্ধু উদ্যান
- ভসমান পেয়ারা বাজার
- প্লানেট ওয়ার্ল্ড (শিশু পার্ক)
- কলসকাঠী জমিদার বাড়ি
- উলানিয়া জমিদার বাড়ি
ছবিটি তুলেছেনঃ Irfan Al-Hisham Jr.





