যখনই আপনি কোথাও ভ্রমণে যাওয়ার কথা ভাবেন শুরুতেই আপনার মাথায় যেসব প্রশ্ন ঘুরপাক খায় তার মধ্যে অন্যতম হলো কীভাবে যাওয়া যায়, অর্থাৎ কোন মাধ্যমে ভ্রমণ করলে স্বল্প খরচে আরামদায়কভাবে গন্তব্যস্থলে পৌঁছানো সম্ভব। আপনার নির্ধারিত স্থানটি যদি হয়ে থাকে বরিশাল কিংবা পটুয়াখালী, তবে নির্দ্বিধায় বেঁছে নিতে পারেন নদীপথকে। ভিন্নধর্মী এক ভ্রমণের স্বাদ আস্বাদনের জন্যও নৌ-যাত্রা দারুণ এক ক্ষেত্র। লঞ্চ ছাড়ার পর থেকে যাত্রাপথজুড়ে আপনার চোখে পড়বে বিভিন্ন রুটের যাত্রীবাহী নৌযান এবং মালবাহী কার্গো। চাঁদনী রাতে লঞ্চ ভ্রমণের সৌভাগ্য হলে জ্যোৎস্নামাখা নদীপথ মুগ্ধতার এক আবেশে জড়িয়ে নেবে আপনাকে।
গভীর রাতে বড় নদীতে প্রায়শই দেখা পাবেন জেলেদের, ঢেউ এর সঙ্গে দুলতে থাকা ছোট ডিঙ্গি নৌকায় জীবন বাজি রেখে মাছ ধরার দৃশ্য আপনার মাঝে সৃষ্টি করবে অন্যরকম এক রোমাঞ্চের। চা-কফি হাতে নিয়ে লঞ্চের করিডর থেকে দৃষ্টিগোচর রাতের নদীর সৌন্দর্য অসাধারণ অনুভূতির সঞ্চার করবে আপনার মনে। দূর নদীতটের মিটমিটে আলো মনের সেই ভালোলাগা বাড়িয়ে দিবে আরও একধাপ। সকালবেলা ঘুম থেকে জেগে বরিশালের কীর্তনখোলা কিংবা পটুয়াখালীর লোহালিয়া নদীর রূপের মাধুর্যে আপনার দিনের সূচনা হয়ে উঠবে দারুণ। নৌ-ভ্রমণের চমৎকার এই অভিজ্ঞতা অর্জনের পাশাপাশি বাজেট অনুযায়ী নানা ধরণের আসনবিন্যাসের সুবিধার ক্ষেত্রেও লঞ্চের জুড়ি নেই। তাই আজকের ব্লগে থাকছে ঢাকা – বরিশাল এবং ঢাকা – পটুয়াখালী রুটে চলাচলকারী বিভিন্ন লঞ্চের যাবতীয় তথ্যাবলী।
বরিশালের লঞ্চ
নদীপথে ঢাকা থেকে বরিশালের দূরত্ব প্রায় ১৬১ কিলোমিটার। প্রতিদিন ঢাকা সদরঘাট থেকে দেশের শীর্ষস্থানীয় বৃহদাকার লঞ্চগুলো বরিশালের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। সাধারণত লঞ্চগুলোর বরিশাল পৌঁছাতে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা সময় লাগে। যাত্রাপথে কোথাও ঘাট না ধরায় এবং দ্রুতগতি সম্পন্ন হওয়ায় লঞ্চগুলো ভোরেই গন্তব্যস্থলে পৌঁছে যায়। এসব লঞ্চে রয়েছে রাডার, ইকোসাউন্ডার, রেডিও সহ আধুনিক সব সরঞ্জাম, যার সাহায্যে লঞ্চগুলো বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতির মোকাবেলা করে থাকে। ঢাকা – বরিশাল রুটে বর্তমানে ১৩টি লঞ্চ চলাচল করছে, পাশাপাশি সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে সরকারী মালিকানাধীন স্টিমার চলাচল করে থাকে। এছাড়া যারা দিনেরবেলা ভ্রমণ করতে চান তারা গ্রীন লাইন ক্যাটামেরানে বরিশাল যেতে পারেন। নিম্নে এসব নৌযানের যোগাযোগ নম্বর, ভাড়া, অনলাইন বুকিং এর মাধ্যম, সময়সূচী এবং সুযোগ-সুবিধাসমূহের বিষয় আলোকপাত করা হলো –
যোগাযোগের নম্বর
এম. ভি. গ্রীন লাইন – ২/৩ (দিবা সার্ভিস) : ১৬৫৫৭ (হটলাইন)
এম. ভি. মধুমতি (বি.আই.ডব্লিউ.টি.সি.) : ০২ ৯৬৬ ৭৯৭৩
এম. ভি. কুয়াকাটা – ২ : +৮৮০ ১৭৮৬০৬১৫৮৫
এম. ভি. কীর্তনখোলা – ১০ : +৮৮০ ১৭৭৮৭৮৬৯৫৪
এম. ভি. সুরভী – ৮ : +৮৮০ ১৭১১৪৫৩৯৮৯
এম. ভি. সুরভী – ৯ : +৮৮০ ১৭১১৯৮৩৫৩৪
এম. ভি. এ্যাডভেঞ্চার – ১ : +৮৮০ ১৭৪৭৬৮৬৯৬৩
এম. ভি. এ্যাডভেঞ্চার – ৯ : +৮৮০ ১৭৪৬১৭৪৫৯৪
এম. ভি. সুন্দরবন – ১০ : +৮৮০ ১৭৫৮১১৩০১১
এম. ভি. সুন্দরবন – ১১ : +৮৮০ ১৭১৮৬৬৪৭০০
এম. ভি. পারাবত – ৯ : +৮৮০ ১৭১১৩৪৪৭৪৬
এম. ভি. পারাবত – ১০ : +৮৮০ ১৭১১৩৪৪৭৪৫
এম. ভি. পারাবত – ১১ : +৮৮০ ১৭১১৩৩০৬৪২
এম. ভি. পারাবত – ১২ : +৮৮০ ১৭৮৯৪৪৮০৮৮
এম. ভি. মানামী : +৮৮০ ১৭১৬২১১৩৬৬
অনলাইন বুকিং এর মাধ্যমসমূহ
www.shohoz.com
www.mvmanami.com
www.greenlinebd.com
app.jolzatra.com
পড়ুন | ঢাকা থেকে বরিশাল বাস ভাড়া ও সময়সূচী
ঢাকা টু বরিশাল লঞ্চ কেবিন ভাড়া
গ্রীন লাইন লঞ্চের ভাড়া
ইকোনমি ক্লাস : ৭০০ টাকা
বিজনেস ক্লাস : ১০০০ টাকা
লঞ্চেরভাড়া
ভি.আই.পি. কেবিন : ৫০০০-৮০০০ টাকা
সেমি ভি.আই.পি. কেবিন : ৩৫০০-৪০০০ টাকা
ফ্যামিলি কেবিন : ২৫০০-৩০০০ টাকা
ডাবল কেবিন : ২০০০ টাকা
সিঙ্গেল কেবিন : ১০০০ টাকা
সোফা : ৬০০ টাকা
ডেক : ২০০ টাকা
[ঈদ বা পর্যটন মৌসুমে ভাড়া পরিবর্তনীয়, তাই এসব ক্ষেত্রে ভ্রমণের পূর্বে লঞ্চে যোগাযোগ করে নেওয়ার পরামর্শ রইলো।]ঢাকা থেকে বরিশাল লঞ্চ ছাড়ার সময়
ঢাকা ও বরিশাল উভয় প্রান্ত হতে লঞ্চগুলো রাত ৮.৩০ মিনিট থেকে ৯.১৫ মিনিটের মধ্যে ঘাট ত্যাগ করে।
সুযোগ-সুবিধাসমূহ
এই রুটের সকল লঞ্চই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। মাঝখানের কেবিন এবং ভি.আই.পি. ও সেমি ভি.আই.পি. কেবিনগুলোতে এসির সু-ব্যবস্থা রয়েছে। কেবিনের যাত্রীদের সেবায় কেবিন বয়রা নিয়োজিত থাকেন। এছাড়া রাতে খাবার জন্য হোটেল (কেবিন যাত্রীরা চাইলে কেবিনেই খাবার অর্ডার করে খেতে পারবেন) এবং হালকা খাবার ক্রয়ের জন্য স্টল রয়েছে। প্রতি কেবিনে টিভি এবং রিভার সাইডের কেবিনে ফ্যান দেওয়া রয়েছে। ফোন চার্জ দেওয়ার জন্য দেওয়া আছে সকেট। পানির জগ এবং গ্লাস, ময়লা ফেলার জন্য বালতি ও এক জোড়া জুতা পেয়ে যাবেন সকল কেবিনে। নিরাপত্তার জন্য এসব লঞ্চে সিসিটিভি ক্যামেরা দেওয়া আছে। এর পাশাপাশি আনসার সদস্য মোতায়েন করা রয়েছে। কিছু লঞ্চে লিফট্ (অসুস্থ এবং শারীরিক সমস্যাগ্রস্থদের জন্য) এবং সিসিইউ (করোনারি কেয়ার ইউনিট) রয়েছে। পাশাপাশি বেশ কিছু লঞ্চে প্রয়োজনীয় মেডিসিন ক্রয়ের সুবিধা রয়েছে। এছাড়াও প্রায় সব লঞ্চেই রয়েছে নামাজের স্থান। নদীর সৌন্দর্য উপভোগের জন্য করিডরে দেওয়া রয়েছে চেয়ার। এর পাশাপাশি নির্দিষ্টসংখ্যক যাত্রীদের জন্য জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জাম মজুদ থাকে এসব লঞ্চে।
ঢাকা-বগা-পটুয়াখালী নৌ-রুট ও রুটের লঞ্চসমূহের তথ্য
ঢাকা থেকে নদীপথে পটুয়াখালীর দূরত্ব প্রায় ২৫২ কিলোমিটার। লঞ্চে পটুয়াখালী যেতে বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী, শীতলক্ষ্যা, মেঘনা, কালাবাদুড়, তেঁতুলিয়া, কারখানা ও লোহালিয়া নদী পাড়ি দিতে হয়। সাধারণত লঞ্চগুলোর পটুয়াখালী পৌঁছাতে ১১ ঘণ্টার কাছাকাছি সময় লাগে। পটুয়াখালী রুটের লঞ্চগুলো ফতুল্লা এবং বগা ঘাট ধরে থাকে। পটুয়াখালী দেশের অন্যতম জনপ্রিয় নৌ-রুট হওয়ার কারণে এই রুটের লঞ্চগুলো আকারে বেশ বড় এবং আধুনিক সরঞ্জামযুক্ত। পটুয়াখালী রুটে ৯টি লঞ্চ চলাচল করে। নিম্নে এসব লঞ্চের যোগাযোগ নম্বর, অনলাইন বুকিং এর মাধ্যম, ভাড়া, সময়সূচী এবং সুযোগ-সুবিধাসমূহের বিষয় আলোকপাত করা হলো –
যোগাযোগের নম্বর
এম. ভি. এ.আর.খান – ১ : ০১৭৬৩৯৩৬২৯৪
এম. ভি. প্রিন্স আওলাদ – ৭ : ০১৭৬০৯৯৮৫৩৬
এম. ভি. সুন্দরবন – ৯ : ০১৭১১৩৫৮৮১০
এম. ভি. সুন্দরবন – ১৪ : ০১৭১১৩৫৮৮১০
এম. ভি. জামাল – ৫ : ০১৭১২৫৬১৫২০
এম. ভি. কুয়াকাটা – ১ : ০১৭৩৬৬২০৫৮০
এম. ভি. কাজল – ৭ : ০১৭৯৮৮৪৯৭৪৭
এম. ভি. সাত্তার খান – ১ : ০১৭৭০৬১৯০৬০
এম. ভি. রয়েল ক্রূজ – ২ : ০১৬৮৫৫৯৯১৯৫
অনলাইন বুকিং এর মাধ্যমসমূহ
www.shohoz.com
app.jolzatra.com
ভাড়া
ভি.আই.পি. কেবিন : ৫০০০-৬৫০০ টাকা
সেমি ভি.আই.পি. কেবিন : ৪০০০ টাকা
ফ্যামিলি কেবিন : ২৫০০ টাকা
ডাবল কেবিন : ২০০০ টাকা
সিঙ্গেল কেবিন : ১১০০ টাকা
ডেক : ২৫০-৩৫০ টাকা
[ঈদ বা পর্যটন মৌসুমে ভাড়া পরিবর্তনীয়, তাই এসব ক্ষেত্রে ভ্রমণের পূর্বে লঞ্চে যোগাযোগ করে নেওয়ার পরামর্শ রইলো।]সময়সূচী
ঢাকা সদরঘাট হতে সন্ধ্যা ৬.০০ থেকে ৬.৩০ মিনিট
পটুয়াখালী লঞ্চঘাট হতে বিকাল ৫.০০ থেকে ৫.১৫ মিনিট
সুযোগ সুবিধাসমূহ
ঢাকা – বগা – পটুয়াখালী রুটে চলাচলকারী সবগুলো লঞ্চ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (ভি.আই.পি., সেমি ভি.আই.পি. এবং মাঝখানের কেবিনগুলো এসি)। রিভার সাইডের কেবিনে ফ্যান এবং সকল কেবিনে টিভি দেওয়া আছে। এছাড়া কেবিনে রয়েছে চার্জ দেওয়ার জন্য সকেট। প্রতি লঞ্চেই ১ম শ্রেণীর যাত্রীদের সেবায় কেবিন বয়রা নিয়োজিত থাকেন। চা-কফি, রাতের খাবার সবই কেবিনে অর্ডার করে খাওয়ার সু-ব্যবস্থা রয়েছে। পাশাপাশি ডিনারের জন্য হোটেল এবং হালকা খাবার ক্রয় করার জন্য স্টলও পাবেন এসব লঞ্চে। করিডরে বসে নদী দেখার জন্য রয়েছে চেয়ার। নামাজ আদায়ের জন্য রয়েছে নির্ধারিত স্থান। দরকারি ঔষধ ক্রয়ের জন্য মেডিসিন কর্নারও পেয়ে যাবেন কিছু লঞ্চে। নির্দিষ্ট পরিমাণ জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জামের মজুদ রয়েছে এই লঞ্চগুলোয়। লঞ্চের নিরাপত্তার জন্য ২ জন আনসার সদস্য মোতায়েন থাকেন।
লঞ্চ ভ্রমণের ক্ষেত্রে যে জিনিসগুলো মাথায় রাখবেন
লঞ্চ ছাড়ার ৩০ মিনিট পূর্বে (ফোনে বা অনলাইলে টিকেট বুক করলে ২ ঘন্টা পূর্বে) লঞ্চে উপস্থিত থাকতে হবে। করোনাকালে ভ্রমণের জন্য এক্সট্রা চাদর নিয়ে যেতে পারেন। কেবিন থেকে বের হয়ে কোথাও গেলে অবশ্যই কেবিনের দরজা ও জানালা বন্ধ আছে কিনা তা চেক করে দেখবেন। লঞ্চের সাইডের কার্নিশ কিংবা ফেন্ডারে দাঁড়ানো থেকে বিরত থাকবেন। অপরিচিত কারো দেওয়া খাবার খাবেন না। সদরঘাটে কুলি দিয়ে মাল বহনের ক্ষেত্রে কুলির সাথে অবশ্যই একজন নজরদারির জন্য থাকবেন। বাইক নিয়ে গেলে আগেই দামাদামি করে নিবেন। চাইলে বাইরে থেকে খাবার এবং পানি কিনে লঞ্চে নিয়ে যেতে পারেন, কারণ লঞ্চে সব খাবারের দাম বাইরের থেকে বেশি রাখা হয়।
ছবিটি তুলেছেনঃ Sk SAJIB KAMRUL

