কেওক্রাডং ভ্রমণ

কেওক্রাডাং

কেওক্রাডং ভ্রমণ পরিকল্পনা

শহুরে জীবনের যান্ত্রিকতায় যদি মন হাপিয়ে উঠে আর প্রকৃতির কাছে নিজেকে সপে দিতে মন চায় এবং আপনার এডভেঞ্চার প্রিয় মন যদি নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমূখী হতে সর্বদায় থাকে উদগ্রীব তবে কেওক্রাডং (Keukradong) হবে । আপনার জন্য এক পারফেক্ট চয়েস। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা, আর তার দুপাশে সবুজের সমারহ, রাশি রাশি তুলতুলে সাদা মেঘ, সাথে হঠাৎ ছোট বড় ঝর্ণার কলকল রব আপানার মনকে আন্দোলিত করবেই। সাথে বাংলাদেশের এক সময়কার সবচেয়ে উঁচু পাহাড়কে নিজের পদনমিত করতে পারার এক দূর্দান্ত এডভেঞ্চার। তাই এই মেঘমুল্লুকে মেঘমল্লার গান শুনতে চাইলে আপনাকে যেতেই হবে কেওক্রাডং।

অবস্থান

কেওক্রাডং বান্দরবান জেলার রুমা উপজেলায় বাংলাদেশ-মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত। কেওক্রাডং নামটি মারমা ভাষা থেকে এসেছে। মারমা ভাষায় কেও শব্দের অর্থ “পাথর” কাড়া মানে “পাহাড়” আর ডং মানে “সবচেয়ে উঁচু” অর্থাৎ সবচেয়ে উঁচু পাথরের পাহাড়। এই পর্বত শৃঙ্গটি ৩১৭২ ফুট উচ্চতার যা একসময় বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু পর্বত শৃঙ্গ হিসাবে পরিচিত ছিল। যদিও বর্তমানে নানা আধুনিক গবেষণায় তা ভূল প্রমানিত হয়েছে। বর্তমানে এটি পঞ্চম সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ।

কেওক্রাডং যাওয়ার উপায়

কেওক্রাডং যেতে হলে প্রথমেই আপনাকে যেতে হবে বান্দরবান। ঢাকা থেকে সরাসরি ছেড়ে যাওয়া বান্দরবানগামী বিভিন্ন বাস কিংবা ট্রেন ও প্লেনে চট্টগ্রাম হয়ে তারপর বান্দরবান যেতে পারবেন। ঢাকার কল্যানপুর, কমলাপুর, আরামবাগ, সায়দাবাদ থেকে প্রতিদিনই শ্যামলি, ইউনিক, হানিফ, ডলফিন, দেশ সাহ নানা পরিবহন কম্পানীর এসি ও নন-এসি বাস ছেড়ে যায়।



জনপ্রতি ভাড়া নন-এসি ৫৫০-৭৫০ এবং এসি ১২০০-১৫০০ টাকার মধ্যে। রাতের বাসে রওনা দিলে সকাল ৬:৩০ এর মধ্যে বান্দরবান পৌছে যেতে পারবেন। এছাড়া প্লেনে বা ট্রেনে চট্টগ্রাম আসলে সেখান থেকে মাইক্রবাস ভাড়া করেও বান্দরবান যেতে পারবেন সেক্ষেত্রে ভাড়া পড়বে ৩০০০-৩৫০০ টাকা। এছাড়া বদ্দারহাট থেকে পূবালী ও পূর্বানী পরিবহনের বাস ছেড়ে যায়। ভাড়া ২২০ টাকা।

বান্দরবান থেকে রুমা বাজার

বান্দরবান শহরে নেমে এরপর আপনাকে যেতে হবে রুমা উপজেলার রুমা বাজার এলাকায়। দূরত্ব প্রায় ৪৮ কিলোমিটার, যা বাস বা চান্দেরগাড়ি রিজার্ভ করে যাওয়া যাবে। বাসে যেতে হলে প্রথমে ১৫ টাকা অটো ভাড়া দিয়ে বাসস্ট্যান্ডে যেতে হবে, যেখান থেকে রুমা বাজারের উদ্দেশ্যে সকাল ৮টা থেকে প্রতি ঘন্টাতেই বাস ছেড়ে যায়। ভাড়া পরবে ১১০ টাকা। এছাড়া দলে সদস্য সংখ্যা বেশী হলে চান্দেরগাড়ি রিজার্ভ করে যেতে পারেন। যেখানে ১০-১৫ জন বসতে পারবেন এবং ভাড়া ৪-৫ হাজার। সময় লাগবে ২.৫-৩ ঘন্টা।

রুমা বাজার থেকে বগালেক

রুমাবাজারে নেমে সরকারী নিবিন্ধকৃত গাইড লিষ্ট থেকে একজন গাইডকে ঠিক করতে হবে যিনি আপনাকে বগালেক, কেওক্রাডং-এ পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবেন। এখানে গাইড নেওয়া বাধ্যতামূলক। থাকা খাওয়া সহ ২ দিনের গাইড খরচ পড়বে প্রায় ১৫০০ – ২০০০ টাকা। কয়েকজন গাইডের লিষ্ট ও নাম্বারঃ

  •  সিয়াম ভাই-০১৮৬৮১৯৯৪১৮
  •  নিউটন ভাই-০১৮৪৫৭৭৯৭৪৯
  •  আলমগীর ভাই-০১৮৪০৫৬৮০৮০

রুমা বাজারে নেমেই আর্মি ক্যাম্পে নিজের বা দলের সবার নাম, ঠিকানা, ফোন নাম্বার, জাতীয় পরিচয় পত্রের ফটো কপি ইত্যাদি তথ্য দিয়েবগালেকে যাওয়ার অনুমতি নিতে হবে। এক্ষেত্রে গাইডেরাই আপনাদের সর্বাত্তক হেল্প করবেন।



মনে রাখবেন বিকাল ২ টার পর আর্মিক্যাম্প থেকে কিন্তু আর অনুমতি দেওয়া হয় না । রুমা বাজার থেকে বগালেকে যাওয়ার চান্দেরগাড়ী বা জীপ ভাড়া পাওয়া যায়। এখানেও এক গাড়িতে বসা যায় ১০-১৫জন এবং ভাড়া পড়বে প্রায় ১০০০- ১৫০০ টাকা। দূরত্ব প্রায় ১৮ কিলোমিটার আর সময় লাগবে প্রায় ১ঘন্টা।এছাড়া সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত লোকাল চান্দের গাড়ীও পাওয়া যায় সেক্ষেত্রে ভাড়া লাগবে ১০০ টাকা।

বগালেক থেকে কেওক্রাডং

বগালেকে নেমেও আর্মিক্যাম্পে আবার নাম রেজিষ্ট্রি করে কেওক্রাডং যাওয়ার অনুমতি নেওয়া লাগবে। এক্ষেত্রে আপনি চাইলে বগালেকে রাত্রিযাপন করে পরের দিন সকালে কেওক্রাডং যেতে পারেন অথবা সেদিনই কেওক্রাডং এর উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে পারেন। তবে রাত্রিযাপন করতে চাইলে এখানে আধুনিক কোন হোটেল বা রিসোর্ট নেই, আদিবাসীদের কটেজগুলোই ভরসা। সেক্ষেত্রে সিস্টেমটাও বেশ আলাদা। গণরুম টাইপের বিশাল এক রুমে সকলে একসাথে ঘুমানো। মানুষ প্রতি ভাড়া পরবে ১২০-১৫০ টাকা প্রতি রাতে। এছাড়া এসব কটেজেই খাবার পেয়ে যাবেন। বগালেক থেকে পরেরদিন সকালে রওনা দিয়ে কেওক্রাডং পৌছাতে সময় লাগবে প্রায় ৪ঘন্টা। দূরত্ব প্রায় ৮-৯ কিলোমিটার। সময় মূলত নির্ভর করবে আপনার চলার গতির উপর, সে হিসেবে কম-বেশীও লাগতে পারে। পথেই পেয়ে যাবেন চিংড়ি ঝর্ণা আর অনিন্দ্য সুন্দর দার্জিলিং পাড়া। এই চলতি পথে পেয়ে যাবেন পাহাড়ি কমলা, কলা, পেয়ারা সহ নানা ফলমূল ও শরবত।

থাকবেন কোথায়

দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় এখানে ভালোমানের কোন হোটেল বা রিসোর্ট নেই। এখানেও আদিবাসীদের কটেজই ভরসা। থাকার সিস্টেমটিও বগালেকের মত প্রতি রুমে ৮-১০জন। কটেজভেদে জনপ্রতি ভাড়া ১০০-৩০০ টাকা। এটি মূলত নির্ভর করে পর্যটকের ভিড়ের উপর। তবে গাইডদের বলে রাখলে তারা আগে থেকেই ব্যবস্থা করে রাখে। নিচে একটি কটেজের তালিকা ও ফোন নাম্বার দেওয়া হলোঃ

কেওক্রাডং টুরিষ্ট মোটেলঃ একদম কেওক্রাডং এর চূড়ায় অবস্থিত এর অসাধারন ভিউয়ের জন্য তুমুল জনপ্রিয়। ছুটির দিনগুলোতে বুকিংদিতে রীতিমত সংগ্রাম করতে হয়।



প্রতিরাত থাকার জন্য রাত প্রতি খরচ পরবে ১৫০-৩০০টাকা। এই কটেজে বুকিং দিতে চাইলে +৮৮০১৮৮০৩২০৯৩১ এই নাম্বারে যোগাযোগ করতে পারেন অথবা গাইডকে বলে রাখলে তিনিই ব্যবস্থা রাখবেন।

ক্লাউডহিল এগ্রো-রিসোর্টঃ এই কটেজটি দার্জিলিং পাড়ায় অবস্থিত। এখানে থাকতে হলে ভাড়া পরবে ১২০-১৫০ টাকা। এখানেথাকতে চাইলে +৮৮০১৮৬৩১১০৬২৩,+৮৮০১৫৩১৭০১৬৫৫ এই নাম্বারে যোগাযোগ করতে পারেন। এছাড়া আপনি কেওক্রাডং-এ রাত্রিযাপন করতে না চাইলে বগালেকে ফিরেও রাত্রিযাপন করতে পারেন।

খাবেন কোথায়

আপনি যে কটেজে থাকবেন সেখানেই খাবার পেয়ে যাবেন। সাধারণত ভাত,ভর্তা, ডাল, ডিম, সবজি সহজেই পেয়ে যাবেন। এছাড়া বন মুরগী খেতে চাইলে আগে থেকে গাইডের মাধ্যমে আগে বলে রাখতে পারেন। নিচে একটি খাবারের লিষ্ট দেওয়া হলো

ভাট, ডাল, আলুভর্তা, ডিম ভূনা—–১৩০টাকা

ভাট, ডাল, সবজি, ডিম ভূনা——১৩০টাকা

ভাট, সবজি, দেশী মুরগী——২০০টাকা

ভাট, সবজি, বয়লার—–১৫০টাকা

ডিম-খিচুড়ি (শুধুমাত্র সকালে)—–১০০টাকা

টিপস

১. কেওক্রাডং যাওয়ার উপযুক্ত সময় নভেম্বর-মার্চ। এসময় বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকায় রাস্তা কম পিচ্ছিল থাকে।

২. কটেজে বিকাল ৬টা-রাত ১০টা জেনারেটর চলে। এসময় আপনাদের ডিভাইস চার্জ করে নিতে পারবেন।

৩. সবধরনের মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়না। তবে রবি ও টেলিটক পাওয়া যায়।

সতর্কতা

১. পাহাড়ে প্রায়সই পানির বোতল, টিস্যু,চিপসের প্যাকেট পড়ে থাকে। অনুগ্রহপূর্বক ঘুরতে এসে পাহাড়ের পরিবেশ নষ্ট করবেন না।

২. পাহাড়ের মানুষের জীবনযাত্রা ও পোষাক ভিন্ন। তাী তাদের সাথে অশোভন আচরণ করবেন না যাতে তারা কষ্ট পায়।

৩. পাহাড়ি মানুষের অনুমতি ব্যতিত কখনোই ছবি তুলবেন না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!