জাতীয় সংসদ ভবন: ইতিহাস, স্থপতি, আয়তন, আসন সংখ্যা ও যেভাবে যাবেন

সংসদ ভবন

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র জাতীয় সংসদ ভবন। অনন্য স্থাপত্যশৈলী, বিশাল পরিসর, জলাধার ও সবুজের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই ভবন শুধু বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনাই নয়, এটি বিশ্ব স্থাপত্যেরও একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। মার্কিন স্থপতি লুই আই কান (Louis I. Kahn)-এর অসাধারণ নকশায় নির্মিত জাতীয় সংসদ ভবন আজ দেশ-বিদেশের মানুষের কাছে বিশেষ আকর্ষণের একটি স্থাপনা।

কবে এর পরিকল্পনা করা হয়েছিল, কে ছিলেন এর স্থপতি, কত একর জমির ওপর এটি নির্মিত, কখন উদ্বোধন করা হয় এবং জাতীয় সংসদে মোট কতটি আসন রয়েছে—এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসহ জাতীয় সংসদ ভবন সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাক।

জাতীয় সংসদ ভবন কোথায় অবস্থিত?

জাতীয় সংসদ ভবন রাজধানী ঢাকার শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত। ভবনটির দক্ষিণ পাশে রয়েছে মানিক মিয়া এভিনিউ। চারপাশের প্রশস্ত সড়ক, জলাধার, সবুজ প্রাঙ্গণ এবং খোলা পরিবেশ ভবনটির স্থাপত্যিক সৌন্দর্যকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক এলাকাগুলোর কাছাকাছি হওয়ায় জাতীয় সংসদ ভবনে বিভিন্ন দিক থেকে যাতায়াত করা তুলনামূলকভাবে সহজ।

জাতীয় সংসদ ভবনের ইতিহাস

জাতীয় সংসদ ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা শুরু হয় পাকিস্তান আমলে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জন্য একটি আধুনিক আইনসভা ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এর প্রাথমিক পরিকল্পনা শুরু হয় ১৯৫৯ সালে।

পরবর্তীতে সংসদ ভবন নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হয় এবং ১৯৬২ সালে মার্কিন স্থপতি লুই আই কানকে এই প্রকল্পের নকশা তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাঁর অসাধারণ স্থাপত্য পরিকল্পনার ভিত্তিতেই পরবর্তীতে জাতীয় সংসদ ভবন ও এর আশপাশের কমপ্লেক্স গড়ে ওঠে।

নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯৬৪ সালে। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী বিভিন্ন কারণে প্রকল্পের কাজ দীর্ঘ সময় বাধাগ্রস্ত হয়।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সংসদ ভবনের নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু হয় এবং শেষ পর্যন্ত ভবনটি ব্যবহারের উপযোগী হয়ে ওঠে।

১৯৮২ সালের ২৮ জানুয়ারি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার জাতীয় সংসদ ভবনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এরপর একই বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি নতুন সংসদ ভবনে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।

জাতীয় সংসদ ভবনের স্থপতি কে?

জাতীয় সংসদ ভবনের প্রধান স্থপতি ছিলেন বিশ্বখ্যাত মার্কিন স্থপতি লুই আই কান।

লুই আই কান আধুনিক স্থাপত্যের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন স্থপতি হিসেবে পরিচিত। জাতীয় সংসদ ভবনের নকশায় তিনি সরল জ্যামিতিক আকৃতি, বিশাল কংক্রিট কাঠামো, প্রাকৃতিক আলো এবং জলাধারকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করেছেন।

ভবনের দেয়ালে বৃত্ত, অর্ধবৃত্ত, ত্রিভুজ ও আয়তক্ষেত্রের মতো জ্যামিতিক আকৃতির বড় বড় খোলা অংশ এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। দিনের বিভিন্ন সময়ে এসব খোলা অংশ দিয়ে প্রাকৃতিক আলো ভবনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে এবং স্থাপনাটিকে ভিন্ন ভিন্ন রূপ দেয়।

জাতীয় সংসদ ভবন কত একর জায়গার ওপর নির্মিত?

জাতীয় সংসদ কমপ্লেক্সের মোট আয়তন প্রায় **২১৫ একর**। বিশাল এই কমপ্লেক্সের মধ্যে মূল সংসদ ভবনের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রশাসনিক ভবন, সদস্যদের সুবিধার জন্য বিভিন্ন স্থাপনা, রাস্তা, হাঁটার পথ, বাগান ও জলাধার রয়েছে।

এই বিশাল পরিসর এবং ভবন ও প্রকৃতির সমন্বয় জাতীয় সংসদ ভবনের স্থাপত্যকে অন্যান্য সরকারি স্থাপনা থেকে আলাদা করেছে।

জাতীয় সংসদ ভবনের স্থাপত্যশৈলী

জাতীয় সংসদ ভবনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর অনন্য স্থাপত্যশৈলী। লুই আই কান ভবনটির নকশায় জ্যামিতিক আকারের পাশাপাশি আলো, বাতাস, পানি ও খোলা জায়গাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।

মূল ভবনটি একটি বিশাল জ্যামিতিক কাঠামোর মতো দেখতে। ভবনের চারপাশের জলাধার ও খোলা প্রাঙ্গণ পুরো স্থাপনাটিকে একটি স্বতন্ত্র সৌন্দর্য দিয়েছে।

ভবনের বিভিন্ন অংশে বিশাল বৃত্তাকার, অর্ধবৃত্তাকার এবং ত্রিভুজাকার খোলা অংশ রয়েছে। এসব নকশা শুধু সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য নয়; ভবনের ভেতরে প্রাকৃতিক আলো প্রবেশের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

স্থাপত্যের সঙ্গে প্রাকৃতিক পরিবেশের এমন সমন্বয়ের কারণে জাতীয় সংসদ ভবনকে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আধুনিক স্থাপত্য নিদর্শন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

জাতীয় সংসদে কয়টি আসন রয়েছে?

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে বর্তমানে মোট ৩৫০টি আসন রয়েছে। এর মধ্যে ৩০০টি আসন সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের জন্য। ৫০টি আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত।

তবে সংসদ ভবনের মূল অধিবেশন কক্ষের আসন বিন্যাস শুধু ৩৫০ জন সংসদ সদস্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অধিবেশন পরিচালনার প্রয়োজন অনুযায়ী স্পিকার, সংসদীয় কর্মকর্তা, অতিথি ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্যও আসনের ব্যবস্থা রয়েছে।

জাতীয় সংসদ ভবনের উচ্চতা ও অভ্যন্তরীণ সুবিধা

জাতীয় সংসদ ভবনের মূল স্থাপনায় একাধিক স্তর রয়েছে। এর বিভিন্ন অংশে সংসদীয় কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় কক্ষ ও সুবিধা রাখা হয়েছে।

কমপ্লেক্সে রয়েছে:

  • জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষ
  • সংসদ সদস্যদের অফিস ও কক্ষ
  • লাইব্রেরি
  • সম্মেলন কক্ষ
  • অভ্যর্থনা ও বৈঠক কক্ষ
  • প্রশাসনিক কার্যালয়
  • বিভিন্ন সহায়ক স্থাপনা
  • খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুবিধা

সব মিলিয়ে জাতীয় সংসদ কমপ্লেক্সটি শুধু একটি অধিবেশন ভবন নয়; বরং সংসদীয় কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ কমপ্লেক্স হিসেবে পরিকল্পিত।

জাতীয় সংসদ ভবনে কীভাবে যাবেন?

জাতীয় সংসদ ভবন ঢাকার শেরেবাংলা নগরে হওয়ায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে বাস, সিএনজি, রিকশা, ট্যাক্সি কিংবা ব্যক্তিগত গাড়িতে যাওয়া যায়।

গাবতলী থেকে

গাবতলী থেকে জাতীয় সংসদ ভবনের দূরত্ব আনুমানিক ৬–৭ কিলোমিটার। সাধারণত গাবতলী থেকে শ্যামলী, কল্যাণপুর, টেকনিক্যাল, আসাদগেট হয়ে মানিক মিয়া এভিনিউয়ের দিকে যাওয়া যায়।

বাসে গেলে মানিক মিয়া এভিনিউ বা সংসদ ভবন এলাকার কাছাকাছি নেমে পরবর্তী পথ রিকশা বা হেঁটে যেতে পারেন।

মহাখালী থেকে

মহাখালী থেকে বিজয় সরণি হয়ে মানিক মিয়া এভিনিউয়ের দিকে যাওয়া যায়। বাস, সিএনজি, রিকশা কিংবা রাইড-শেয়ারিং সেবার মাধ্যমে এই পথে যাতায়াত করা সম্ভব।

উত্তরা থেকে

উত্তরা থেকে বিমানবন্দর, খিলক্ষেত, বনানী, মহাখালী ও বিজয় সরণি হয়ে সংসদ ভবন এলাকায় যাওয়া যায়। যানজটের ওপর নির্ভর করে এই পথের সময় কম-বেশি হতে পারে।

গুলিস্তান থেকে

গুলিস্তান থেকে শাহবাগ, বাংলামোটর, ফার্মগেট ও মানিক মিয়া এভিনিউ হয়ে জাতীয় সংসদ ভবনের দিকে যাওয়া যায়।

মেট্রোরেলে গেলে

ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে মেট্রোরেলে এসে বিজয় সরণি মেট্রোরেল স্টেশনে নামা যেতে পারে। সেখান থেকে রিকশা, সিএনজি অথবা হেঁটে সংসদ ভবন এলাকায় যাওয়া সম্ভব।

তবে বাসের রুট, ভাড়া ও মেট্রোরেলের সময়সূচি সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই যাত্রার আগে সংশ্লিষ্ট পরিবহনের সর্বশেষ তথ্য যাচাই করে নেওয়া ভালো।

 জাতীয় সংসদ ভবন পরিদর্শনের আগে যেসব বিষয় জানা জরুরি

জাতীয় সংসদ ভবন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনা। তাই এটি সাধারণ পর্যটনকেন্দ্রের মতো অবাধে প্রবেশের জায়গা নয়। ভবনের ভেতরে প্রবেশ বা নির্দিষ্ট এলাকা পরিদর্শনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি এবং নিরাপত্তা বিধি অনুসরণ করতে হতে পারে।

ভ্রমণের আগে নিচের বিষয়গুলো মনে রাখা ভালো

  • ভবনের ভেতরে প্রবেশের প্রয়োজন হলে আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি ও নিয়ম জেনে নিন।
  • প্রয়োজনীয় পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখুন।
  • নিরাপত্তা তল্লাশি ও কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলুন।
  • নিষিদ্ধ বা সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশ করবেন না।
  • ভবন, বাগান, জলাধার ও অন্যান্য স্থাপনার কোনো ক্ষতি করবেন না।
  • ময়লা-আবর্জনা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলুন।
  • ছবি তোলা বা ভিডিও ধারণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধিনিষেধ মেনে চলুন।
  • যাত্রার আগে ঢাকার ট্রাফিক পরিস্থিতি ও আবহাওয়ার অবস্থা দেখে নিন।
  • কোনো নিরাপত্তা নির্দেশনা থাকলে তা অবশ্যই অনুসরণ করুন।

জাতীয় সংসদ ভবনের গুরুত্ব

জাতীয় সংসদ ভবন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। দেশের আইন প্রণয়ন, জাতীয় বাজেট এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অন্যতম প্রধান স্থান এটি।

একই সঙ্গে লুই আই কানের নকশায় নির্মিত এই ভবন বাংলাদেশের স্থাপত্য ইতিহাসেও বিশেষ মর্যাদা বহন করে। কংক্রিটের বিশাল কাঠামোর সঙ্গে জলাধার, সবুজ প্রাঙ্গণ এবং প্রাকৃতিক আলোর সমন্বয় ভবনটিকে একটি অনন্য স্থাপত্য নিদর্শনে পরিণত করেছে।

জাতীয় সংসদ ভবন সম্পর্কে সংক্ষেপে

নাম: জাতীয় সংসদ ভবন
অবস্থান: শেরেবাংলা নগর, ঢাকা
স্থপতি: লুই আই কান
পরিকল্পনার সূচনা: ১৯৫৯ সাল
লুই আই কানের দায়িত্ব গ্রহণ: ১৯৬২ সাল
নির্মাণকাজ শুরু: ১৯৬৪ সাল
কমপ্লেক্সের আয়তন: প্রায় ২১৫ একর
আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন: ২৮ জানুয়ারি ১৯৮২
প্রথম অধিবেশন: ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৮২
জাতীয় সংসদের মোট আসন: ৩৫০টি
সরাসরি নির্বাচিত আসন: ৩০০টি
সংরক্ষিত নারী আসন: ৫০টি

শেষ কথা

জাতীয় সংসদ ভবন শুধু বাংলাদেশের আইনসভা পরিচালনার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান নয়; এটি দেশের ইতিহাস, গণতন্ত্র ও আধুনিক স্থাপত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। লুই আই কানের পরিকল্পনায় নির্মিত এই অসাধারণ স্থাপনা জ্যামিতিক নকশা, প্রাকৃতিক আলো, জলাধার ও সবুজ পরিবেশের সমন্বয়ে বাংলাদেশের স্থাপত্য ঐতিহ্যে একটি বিশেষ স্থান করে নিয়েছে।

ঢাকায় ঘোরার পরিকল্পনা করলে জাতীয় সংসদ ভবনের আশপাশের স্থাপত্য ও পরিবেশ অবশ্যই আপনার ভ্রমণ তালিকায় রাখতে পারেন। তবে ভবনটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনা হওয়ায় ভ্রমণের আগে প্রবেশাধিকার, নিরাপত্তা বিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ নির্দেশনা জেনে নেওয়া সবচেয়ে ভালো।

এই পোস্টটি কেমন লেগেছে?

রেটিং দিতে নিচের স্টারগুলোতে ক্লিক করুন।

Average rating 0 / 5. Vote count: 0

এখনও কোনো রেটিং পড়েনি। আপনিই প্রথম রেটিং দিন।

আপনার মন্তব্য লিখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!