চন্দ্রিমা উদ্যান থেকে জিয়া উদ্যান: ইতিহাস ও ভ্রমণ গাইড ২০২৬

চন্দ্রিমা উদ্যান

চন্দ্রিমা উদ্যান (জিয়া উদ্যান)ঢাকার শেরেবাংলা নগরে জাতীয় সংসদ ভবনের পাশে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক ও সবুজ বিনোদনকেন্দ্র। স্থানটি আগে চন্দ্রিমা উদ্যান নামে পরিচিত ছিল। ১৯৯৬ সালে জিয়া উদ্যানের নাম পরিবর্তন করে চন্দ্রিমা উদ্যান রাখা হয়। পরে ১১ মার্চ ২০২৫ সালের সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আবার ‘জিয়া উদ্যান’ নামটি পুনর্বহাল করা হয়।

চন্দ্রিমা উদ্যান: এক নজরে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

বর্তমান নাম : জিয়া উদ্যান
পূর্বের নাম : চন্দ্রিমা উদ্যান
ইংরেজি নাম : Zia Udyan
অবস্থান : শেরেবাংলা নগর, ঢাকা
কাছাকাছি দর্শনীয় স্থান : জাতীয় সংসদ ভবন
আয়তন : প্রায় ৭৪ একর
ধরন : ঐতিহাসিক উদ্যান ও বিনোদনকেন্দ্র
প্রধান আকর্ষণ : সবুজ পরিবেশ, লেক, হাঁটার পথ ও জিয়াউর রহমানের সমাধি
নাম পুনর্বহাল : ১১ মার্চ ২০২৫
ভ্রমণের উপযুক্ত সময় : সকাল ও বিকেল; শীত ও বসন্তকাল বিশেষভাবে উপযোগী

চন্দ্রিমা উদ্যানের ইতিহাস

১৯৮১ সালে শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মৃত্যু হলে তাঁকে শেরে বাংলা নগরে সমাহিত করা হয়। তাঁর এই সমাধিস্থলকে আরও মর্যাদাপূর্ণ ও দৃষ্টি নন্দন করতে তৎকালীন সরকারিভাবে সেখানে একটি বড় পরিসরে স্মৃতি উদ্যান তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরকল্পনা অনুযায়ী বিভিন্ন প্রজাতির গাছ, সবুজ ঘাস, কৃত্রিম লেক, সেতু ও ওয়াক ওয়ের মতো কাজের মধ্য দিয়ে উদ্যানটিকে বেশ সমৃদ্ধ করা হয়। জাতীয় সংসদ ভবনের পাশে এমন সজিব প্রকৃতি নির্ভর পরিবেশ তাই সহজেই সমাধিক্ষেত্রটি মানুষের কাছে হয়ে ওঠে প্রশান্তির স্থান। এখন এটি রাজধানীর একটি অন্যতম ভ্রমণ ও বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। প্রথমে জিয়াউর রহমানের সম্মানে এটির নাম জিয়া উদ্যান থাকলেও ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে প্রথম এটির নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন এবং চাঁদের আলোর মতো প্রকৃতির অংশকে  মনে করে নামকরণ করা হয় চন্দ্রিমা উদ্যান। পরবর্তীতে ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকার পুনরায় এটিকে জিয়া উদ্যান নামকরণ করেন।

চন্দ্রিমা উদ্যান কোথায় অবস্থিত

চন্দ্রিমা উদ্যান তথা জিয়া উদ্যানের অবস্থান ঢাকা শহরের শের-ই বাংলা নগরে। জাতীয় সংসদ ভবনের বিপরীতে মানিক মিয়া এভিনিউয়ের ঠিক পাশেই সবুজ গাছ পালার সমারোহে বিস্তার লাভ করেছে এই মনকাড়া উদ্যানটি। অর্থাৎ রাজধানী ঢাকার একদম প্রাণকেন্দ্রই উদ্যানটি যেন মাথা উঁচু করে হাতছানি দেয় দর্শনার্থীদের। 

কীভাবে যাবেন

বাংলাদেশের যেকোনো স্থান থেকে বাস বা ট্রেন যোগে প্রথমে আপনাকে ঢাকায় আসতে হবে। এরপর আপনার বাসস্টপেজ থেকে  সুবিধা মতো সিএনজি, বাস, মেট্রোরেল বা উবার ধরতে পারেন। সেক্ষেত্রে গাবতলি থেকে দূরত্ব হবে ৬-৭ কি. মি. ; মহাখালী থেকে দূরত্ব ৫-৬ কি. মি. ও যাত্রাবাড়ি থেকে দূরত্ব ১৭-১৮ কি. মি.। বাসে যেতে চাইলে যেকোনো লোকাল বাসে চড়ে আসাদ গেটে নেমে সেখান থেকে রিক্সা বা পায়ে হেঁটে সংসদ ভবনের পাশেই পেয়ে যাবেন উদ্যানটি। তবে মেট্রোরেলে আসতে চাইলে আপনাকে আগারগাঁও নেমে যেতে হবে আর সেখান থেকে যেকোনো রিক্সাকে সংসদ ভবনের পাশে জিয়া উদ্যানের কথা বললেই আপনাকে গন্তব্যে নিয়ে যাবে। তবে নির্ঝঞ্ঝাট যেতে চাইলে নিতে পারেন উবার বা সিএনজি তাহলে সোজা ঝামেলা ছাড়া চন্দ্রিমা উদ্যান গেটে নামিয়ে দিবে। তবে সেক্ষেত্রে আপনাকে একটু বাড়তি ভাড়া খরচ করতে হবে। 

বিশেষ সুবিধার জন্য ভ্রমণের পূর্বে বাসপথে রুটগুলো দেখে নিতে পারেন –

১। গাবতলী – কল্যানপুর – শ্যামলী – কলেজ গেট- আসাদগেট – খামারবাড়ি – ফার্মগেট

এই রুটে বাস পাবেন – বসুমতি, রমজান, এম এম লাভলি, ৭ নং সহ বেশকিছু লোকাল বাস

২। মহাখালী – আগারগাঁও – ফার্মগেট- খামারবাড়ি/সংসদ ভবন

এই রুটে বাস পাবেন – বিআরটিসি, সুপার বাস

৩। যাত্রাবাড়ি – গুলিস্তান – শাহবাগ- খামারবাড়ি – আসাদ গেট 

এই রুটে বাস পাবেন – 

এই রুটে বাস পাবেন বিকাশ ও অগ্রদূত পরিবহণ।

তবে রুট ও দূরত্ব ভেদে ভাড়ার কম বেশি হতে পারে সেটি আগেই শুনে নিবেন। 

যারা মেট্রোরেলে আসতে চান তাদের জন্য রুটগুলো হলো –

১। উত্তরা – মিরপুর ১১ – মিরপুর ১০ – কাজীপাড়া – শেওড়াপাড়া – আগারগাঁও 

২। মতিঝিল – ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের – শাহবাগ – ফার্মগেট – আগারগাঁও 

এই দুটো রুট বহুল ব্যবহৃত।

চন্দ্রিমা উদ্যান খোলা ও বন্ধের সময়সূচী

উদ্যানটি একটি সমাধিক্ষেত্র প্রকৃতির প্রচুর্যঘেরা হওয়ায় জনসাধারণের জন্য সারাবছরই খোলা থাকে । প্রতিদিন সকাল ৬ টা থেকে রাত ৯ টা পর্যন্ত এই বিনোদন কেন্দ্রটি সাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকে। সবচেয়ে ভালো দিক হলো, দর্শনার্থীপ্রিয় এতো সুন্দর সবুজ ঘেরা নিরিবিলি একটি স্থানে প্রবেশে এখন পর্যন্ত কোনো টিকিটের প্রয়োজন হয় না। ঢাকা শহরের যানজট, রাস্তার দূরত্ব ও আবহাওয়ার উপর নির্ভর করে সাধারণত বিকেল ৪ থেকে ৭ টার মধ্যে এখানে ভ্রমণ খুবই উপভোগ্য। সপ্তাহের রবি থেকে মঙ্গলবার এর মধ্যে যেকোনো দিন পছন্দ করলে আপনার ভ্রমণ হবে খুবই আরামদায়ক কারণ সাপ্তাহিক ছুটির শুক্র ও শনিবার পার্কটিতে প্রচুর জনসমাগম হয়। তবে যারা এমন নির্মল প্রকৃতিতে ইয়োগা, শারীরিক ব্যায়াম বা জগিং করতে চান তারা সকালের সময়টা বেছে নিতে পারেন। বর্ষাকালে উদ্যানটি বেশি সজিব দেখায় তবে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস সবচেয়ে ভালো সময়। বিশেষ করে বসন্তকালে কৃষ্ণচূড়ার লালচে আভা যেকারো মন হরণ করতে প্রস্তুত। আর সারি সারি কৃষ্ণচূড়ার রক্তিম বর্ণের ফুলগুলো বহুদূর থেকে যেমন সবার নজর কাড়ে তেমনি ফটোপ্রেমিদের জন্য এটি এক অতুলনীয় স্থান।

চন্দ্রিমা উদ্যান (জিয়া উদ্যান) সম্পর্কে সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

১. জিয়া উদ্যান কোথায় অবস্থিত?

জিয়া উদ্যান ঢাকার শেরেবাংলা নগরে জাতীয় সংসদ ভবনের পাশে, মানিক মিয়া এভিনিউ সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত। রাজধানীর কেন্দ্রীয় এলাকায় হওয়ায় বাস, মেট্রোরেল, রিকশা, সিএনজি ও ride-sharing-এর মাধ্যমে এখানে যাওয়া যায়।

২. জিয়া উদ্যানের আগের নাম কী ছিল?

জিয়া উদ্যানের আগের নাম ছিল চন্দ্রিমা উদ্যান। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে উদ্যানটির নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। বর্তমানে সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এর নাম জিয়া উদ্যান

৩. চন্দ্রিমা উদ্যানের বর্তমান নাম কী?

চন্দ্রিমা উদ্যানের বর্তমান নাম জিয়া উদ্যান। ১১ মার্চ ২০২৫ সালের সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে “জিয়া উদ্যান” নামটি পুনর্বহাল করা হয়।

৪. জিয়া উদ্যানে কীভাবে যাব?

ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে বাস, মেট্রোরেল, রিকশা, সিএনজি বা Uber/ride-sharing ব্যবহার করে জিয়া উদ্যানে যাওয়া যায়। জাতীয় সংসদ ভবন বা মানিক মিয়া এভিনিউকে গন্তব্য হিসেবে ব্যবহার করলে জায়গাটি খুঁজে পাওয়া সহজ।

৫. মেট্রোরেলে জিয়া উদ্যানে কীভাবে যাওয়া যায়?

মেট্রোরেলে ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে কাছাকাছি সুবিধাজনক স্টেশনে নামার পর রিকশা, সিএনজি বা ride-sharing নিয়ে জিয়া উদ্যানে যাওয়া যায়। মেট্রোরেলের রুট ও স্টেশন পরিবর্তন হতে পারে, তাই ভ্রমণের আগে বর্তমান রুট যাচাই করে নেওয়া ভালো।

৬. জিয়া উদ্যান কি প্রতিদিন খোলা থাকে?

জিয়া উদ্যানের বর্তমান খোলার সময় ও প্রবেশের নিয়ম পরিবর্তিত হতে পারে। তাই ভ্রমণের আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সর্বশেষ সময়সূচি নিশ্চিত করে নেওয়া সবচেয়ে ভালো।

৭. জিয়া উদ্যানে প্রবেশ করতে কি টিকিট লাগে?

প্রবেশমূল্য বা টিকিটের নিয়ম সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই ২০২৬ সালে ভ্রমণের আগে সর্বশেষ প্রবেশমূল্য ও নিয়ম কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে যাচাই করে নেওয়া উচিত।

৮. জিয়া উদ্যানে কী কী দেখা যায়?

জিয়া উদ্যানে সবুজ গাছপালা, খোলা পরিবেশ, জলাশয়, হাঁটার জায়গা এবং জিয়াউর রহমানের সমাধিস্থল রয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় সংসদ ভবনের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে আশপাশের স্থাপত্য ও পরিবেশও দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে।

৯. জিয়া উদ্যান ভ্রমণের সবচেয়ে ভালো সময় কখন?

সকালের সময় হাঁটা, ব্যায়াম বা নিরিবিলি পরিবেশ উপভোগের জন্য ভালো। বিকেলেও উদ্যানের পরিবেশ উপভোগ করা যায়। সাধারণত শীত ও বসন্তকালে ঢাকার আবহাওয়া তুলনামূলক আরামদায়ক হওয়ায় ঘোরার জন্য সময়টি বেশি উপযোগী।

১০. জিয়া উদ্যান কি পরিবার নিয়ে ঘুরতে যাওয়া যায়?

হ্যাঁ, সবুজ পরিবেশে অবসর কাটানো ও হাঁটাহাঁটির জন্য পরিবার নিয়ে জিয়া উদ্যানে যাওয়া যায়। তবে শিশুদের সবসময় নজরদারিতে রাখা এবং জলাশয় বা ঝুঁকিপূর্ণ স্থান থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা উচিত।

বিশেষ সতর্কতা 

  • নিজের ব্যবহৃত পানির বোতল, চিপসের প্যাকেট বা ফলের খোসার মতো জিনিসগুলো  যত্রতত্র ফেলবেন না।
  • উদ্যানের লেকে গোসল করা থেকে বিরত থাকুন এবং লেকের পানিতে মাছ ধরা থেকে বিরত থাকুন।
  • অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে আলাপচারিতায় সতর্ক থাকবেন ও অন্যের দেওয়া জিনিস খাবেন না।
  • গ্রীষ্মকালে সঙ্গে পানি, স্যালাইন, টিস্যু ও সানগ্লাস রাখুন এবং তুলনামূলক সফট ড্রেস পরিধান করুন।
  • উদ্যানে ধূমপানসহ অসামাজিক কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকুন।
  • আপনার সন্তানকে হাত ধরে রাখবেন ও ঝুকিপূর্ণ স্থানগুলোতে সাবধানতা অবলম্বন করুন
  • উদ্যানে গাছপালা ও জীববৈচিত্র্যেরের ক্ষতি করা থেকে দূরে থাকুন ও অন্যকেও এ ব্যপারে সচেতন করুন।

আরও পড়ুন

Photo Taken : Tanjil Rahman

এই পোস্টটি কেমন লেগেছে?

রেটিং দিতে নিচের স্টারগুলোতে ক্লিক করুন।

Average rating 0 / 5. Vote count: 0

এখনও কোনো রেটিং পড়েনি। আপনিই প্রথম রেটিং দিন।

আপনার মন্তব্য লিখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!