তারা মসজিদ, ঢাকা: ইতিহাস, কোথায়, যাওয়ার উপায়, প্রবেশমূল্য ও ভ্রমণ গাইড

পুরান ঢাকার আরমানিটোলায় ঐতিহাসিক তারা মসজিদ

পুরান ঢাকার আরমানিটোলায় ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তারা মসজিদ। সাদা-নীল তারার নকশায় সাজানো এই মসজিদ ঢাকার অন্যতম সুন্দর ঐতিহাসিক স্থাপনা। মসজিদের দেয়াল, গম্বুজ ও ভেতরের কারুকাজ সহজেই দর্শনার্থীদের নজর কাড়ে। পুরান ঢাকার ঐতিহ্য দেখতে চাইলে তারা মসজিদ আপনার ভ্রমণ তালিকায় রাখতে পারেন।

মসজিদের নকশায় চীনামাটির টুকরা, রঙিন কাচ ও টাইলসের সুন্দর ব্যবহার রয়েছে। গম্বুজের অসংখ্য তারার নকশার কারণেই এর নাম হয়েছে তারা মসজিদ। আজ আমরা জানবো তারা মসজিদ কোথায়, এর ইতিহাস, এখানে কী দেখবেন, কীভাবে যাবেন, প্রবেশ করতে কত টাকা লাগে এবং কখন গেলে ভালো।

তারা মসজিদ এক নজরে

নাম তারা মসজিদ / Star Mosque
অবস্থান আরমানিটোলা, পুরান ঢাকা
ঠিকানা ৮, আবুল খয়রাত সড়ক
নির্মাতা মির্জা গোলাম পীর
নির্মাণকাল সুনির্দিষ্ট সাল নিশ্চিত নয়
প্রাথমিক গম্বুজ ৩টি
বর্তমান গম্বুজ ৫টি
উল্লেখযোগ্য সংস্কার ১৯২৬
বড় সম্প্রসারণ ১৯৮৭
উল্লেখযোগ্য অলংকরণ চিনি টিকরি মোজাইক
প্রবেশমূল্য নির্ধারিত টিকিট নেই

তারা মসজিদ কোথায় অবস্থিত? 

তারা মসজিদ ঢাকার পুরান ঢাকার আরমানিটোলা এলাকায় আবুল খয়রাত সড়কে অবস্থিত। মসজিদটির ঠিকানা ৮ নম্বর আবুল খয়রাত সড়ক।

তারা মসজিদের ইতিহাস

তারা মসজিদের নির্মাণের সুনির্দিষ্ট সাল জানা যায় না। মসজিদে নির্মাণকাল উল্লেখ করা কোনো শিলালিপিও পাওয়া যায়নি। তবে ইতিহাসবিদদের মতে, ঢাকার জমিদার মির্জা গোলাম পীরের সময়ে ১৯শ শতকের প্রথমার্ধে মসজিদটি নির্মিত হয়ে থাকতে পারে।

১৯২৬ সালে ব্যবসায়ী আলী জান ব্যাপারী মসজিদটির বড় ধরনের সংস্কার করেন। এ সময় মসজিদের পূর্বদিকে বারান্দা যুক্ত করা এবং রঙিন টাইলস দিয়ে মসজিদটি অলংকরণের কাজ করা হয়। ১৯৮৭ সালে তারা মসজিদের নামাজের স্থান আরও সম্প্রসারণ করা হয়। এ সময় দুটি নতুন গম্বুজ ও তিনটি নতুন মেহরাব যুক্ত করা হয়। ফলে আগের তিন গম্বুজের মসজিদটি বর্তমান পাঁচ গম্বুজের রূপ পায়।

তারা মসজিদে কী দেখবেন

তারা মসজিদের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর দৃষ্টিনন্দন কারুকাজ। এখানে বিশেষভাবে দেখতে পারেন—

  • মাউন্ট ফুজির নকশা: তারা মসজিদের অলংকরণে জাপানের মাউন্ট ফুজি বা ফুজিসানের নকশা দেখা যায়। এটি মসজিদের অন্যতম আকর্ষণীয় ও ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য।
  • চিনি টিকরির কাজ: চীনামাটির টুকরা ও রঙিন কাচ দিয়ে তৈরি মোজাইক নকশা দেখতে পারবেন।
  • গম্বুজ: বর্তমানে মসজিদে পাঁচটি গম্বুজ রয়েছে। গম্বুজগুলোতে তারার নকশা করা হয়েছে।
  • ফুল ও অন্যান্য অলংকরণ: মসজিদের দেয়াল ও বিভিন্ন অংশে ফুল, লতাপাতা, রোজেট, চাঁদ, তারা এবং আরবি ক্যালিগ্রাফির নকশা রয়েছে।
  • মেহরাব: মসজিদের ভেতরের মেহরাবগুলোর নকশাও বেশ আকর্ষণীয়।
  • রঙিন টাইলস ও কাচ: ভেতর ও বাইরের বিভিন্ন অংশে টাইলস এবং রঙিন কাচের ব্যবহার দেখতে পারবেন।

কীভাবে যাবেন

ঢাকা শহর থেকে

ঢাকার যেকোনো এলাকা থেকে বাস, রিকশা, সিএনজি বা রাইড শেয়ার করে পুরান ঢাকার আরমানিটোলা যেতে পারেন। সরাসরি তারা মসজিদ যেতে চাইলে চালককে আবুল খয়রাত রোড, তারা মসজিদ বললেই হবে।

গুলিস্তান থেকে রিকশা বা সিএনজিতে যেতে পারেন। গুলিস্তান থেকে সিদ্দিক বাজার হয়ে বংশালের দিকে যেতে হবে। এরপর মাহুতটুলী চৌরাস্তা থেকে আবুল খয়রাত রোডে ঢুকলেই তারা মসজিদ পাওয়া যাবে।

চানখাঁরপুল থেকে রিকশা বা অটোরিকশায় সরাসরি আরমানিটোলা যেতে পারেন। রিকশা বা সিএনজির ভাড়া দূরত্ব, সময় ও দরদামের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হতে পারে।

সদরঘাট থেকে রিকশা বা সিএনজি নিয়ে আরমানিটোলার দিকে যেতে পারেন। একইভাবে বাবুবাজার ব্রিজ থেকেও রিকশা বা সিএনজি পাওয়া যায়।

ঢাকার অন্য এলাকা থেকে সরাসরি রাইড শেয়ার নিলে সবচেয়ে সহজ হবে। পুরান ঢাকার সরু রাস্তায় গাড়ি ঢোকার সুযোগ না থাকলে কাছাকাছি জায়গায় নেমে রিকশায় যেতে পারেন।

দেশের অন্যান্য স্থান থেকে

ঢাকার বাইরে থেকে যারা আসবেন তারা প্রথমে ঢাকায় এসে গুলিস্তান, সদরঘাট বা চানখাঁরপুল এলাকায় নামতে পারেন। সেখান থেকে রিকশা, সিএনজি বা রাইড শেয়ারে সহজেই তারা মসজিদে যেতে পারবেন।

প্রবেশ করতে কত টাকা লাগে?

তারা মসজিদে প্রবেশ করতে কোনো টাকা লাগে না। এখানে কোনো প্রবেশ টিকিটের ব্যবস্থা নেই। তবে এটি একটি সক্রিয় মসজিদ। তাই নামাজের সময় দর্শনার্থীদের ভেতরে প্রবেশ না করাই ভালো।

কখন গেলে ভালো হবে?  

  • সকাল বা বিকেল ভালো
  • জুমার সময় এড়িয়ে চলা ভালো
  • নামাজের সময় দর্শনার্থীদের সতর্ক থাকা উচিত
  • ছবি তুললে মুসল্লিদের বিরক্ত করা যাবে না
  • মসজিদের নিজস্ব নিয়ম মেনে চলতে হবে

কত সময় হাতে রাখবেন?

শুধু তারা মসজিদ দেখতে গেলে ৩০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা যথেষ্ট। তবে পুরান ঢাকার অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থানের সঙ্গে মিলিয়ে ভ্রমণ করলে আরও বেশি সময় হাতে রাখা ভালো।

তারা মসজিদ সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন ও উত্তরঃ 

তারা মসজিদ কোথায় অবস্থিত?

তারা মসজিদ ঢাকার পুরান ঢাকার আরমানিটোলা এলাকায় আবুল খয়রাত সড়কে অবস্থিত। মসজিদটির ঠিকানা ৮ নম্বর আবুল খয়রাত সড়ক, আরমানিটোলা, পুরান ঢাকা, ঢাকা।

তারা মসজিদ কে নির্মাণ করেন?

তারা মসজিদের নির্মাতা হিসেবে ঢাকার জমিদার মির্জা গোলাম পীরের নাম উল্লেখ করা হয়। মসজিদটি শুরুর দিকে ‘মির্জা সাহেবের মসজিদ’ নামেও পরিচিত ছিল

তারা মসজিদ কত সালে নির্মিত?

তারা মসজিদ নির্মাণের সুনির্দিষ্ট সাল নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। মসজিদে নির্মাণকাল উল্লেখ করা কোনো শিলালিপিও পাওয়া যায়নি। তবে ইতিহাসবিদদের মতে, মির্জা গোলাম পীরের সময়ে ১৯শ শতকের প্রথমার্ধে মসজিদটি নির্মিত হয়ে থাকতে পারে।

তারা মসজিদের নাম তারা মসজিদ কেন?

মসজিদের দেয়াল ও গম্বুজে অসংখ্য নীল তারার নকশা রয়েছে। এই তারকাখচিত অলংকরণের কারণেই মসজিদটির নাম ‘তারা মসজিদ’ বা Star Mosque হয়েছে। বিশেষ করে ১৯২৬ সালের সংস্কারের পর মসজিদের তারার নকশা এর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়।

তারা মসজিদে কয়টি গম্বুজ আছে?

বর্তমানে তারা মসজিদে পাঁচটি গম্বুজ রয়েছে। মসজিদটির প্রাথমিক কাঠামোতে তিনটি গম্বুজ ছিল। পরে ১৯৮৭ সালে সম্প্রসারণের সময় আরও দুটি গম্বুজ যুক্ত করা হয় এবং মসজিদটি বর্তমান পাঁচ গম্বুজের রূপ পায়।

তারা মসজিদের বিশেষত্ব কী?

তারা মসজিদের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো এর দৃষ্টিনন্দন তারার নকশা, চিনি টিকরি মোজাইক, রঙিন টাইলস ও কাচের অলংকরণ। মসজিদের দেয়াল ও বিভিন্ন অংশে ফুল, লতাপাতা, চাঁদ, তারা এবং অন্যান্য নকশা দেখা যায়। বাইরের অলংকরণে মাউন্ট ফুজির নকশাও রয়েছে। এসব কারণে তারা মসজিদ পুরান ঢাকার অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে পরিচিত।

চিনি টিকরি কী?

চিনি টিকরি হলো ছোট ছোট চীনামাটির টুকরা ও রঙিন কাচ দিয়ে তৈরি এক ধরনের মোজাইক অলংকরণ। তারা মসজিদের দেয়াল, গম্বুজ ও বিভিন্ন স্থানে এই ধরনের কারুকাজ দেখা যায়। সূক্ষ্ম নকশা ও রঙের বৈচিত্র্যের কারণে চিনি টিকরির কাজ মসজিদের অন্যতম আকর্ষণ।

তারা মসজিদে প্রবেশ করতে কত টাকা লাগে?

তারা মসজিদে প্রবেশের জন্য কোনো নির্ধারিত প্রবেশমূল্য বা টিকিট নেই। তবে এটি একটি সক্রিয় মসজিদ। তাই নামাজের সময় এবং ধর্মীয় কার্যক্রম চলাকালে মুসল্লিদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে দর্শনার্থীদের সতর্কতা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা উচিত।

তারা মসজিদ কখন গেলে ভালো?

তারা মসজিদ দেখতে সকাল বা বিকেলে যাওয়া ভালো। এ সময় প্রাকৃতিক আলোতে মসজিদের টাইলস, তারার নকশা ও স্থাপত্যের বিভিন্ন অংশ ভালোভাবে দেখা যায়। শুক্রবার জুমার সময়সহ নামাজের ব্যস্ত সময় এড়িয়ে যাওয়া ভালো, যাতে মুসল্লিদের ইবাদতে কোনো ধরনের অসুবিধা না হয়।

তারা মসজিদের কাছে কী কী দর্শনীয় স্থান আছে?

তারা মসজিদ পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় আশপাশে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় স্থান রয়েছে। ভ্রমণ পরিকল্পনা অনুযায়ী আহসান মঞ্জিল, লালবাগ কেল্লা, সদরঘাট, বড় কাটরা, ছোট কাটরাসহ পুরান ঢাকার অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থাপনা ঘুরে দেখতে পারেন। তবে প্রতিটি স্থানের বর্তমান খোলার সময় ও প্রবেশমূল্য ভ্রমণের আগে যাচাই করে নেওয়া ভালো।

আরও পড়ুন

এই পোস্টটি কেমন লেগেছে?

রেটিং দিতে নিচের স্টারগুলোতে ক্লিক করুন।

Average rating 0 / 5. Vote count: 0

এখনও কোনো রেটিং পড়েনি। আপনিই প্রথম রেটিং দিন।

আপনার মন্তব্য লিখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!