ঢাকার ব্যস্ত শহরের মাঝেও সবুজ পরিবেশে কিছুটা সময় কাটানোর সুযোগ রয়েছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। ঐতিহাসিক গুরুত্বের পাশাপাশি খোলামেলা পরিবেশের কারণে এটি ঢাকার পরিচিত দর্শনীয় স্থানগুলোর একটি। পরিবার, বন্ধু কিংবা প্রিয়জনের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটাতে চাইলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান রাখতে পারেন আপনার ভ্রমণ তালিকায়।
ঢাকার শাহবাগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার কাছাকাছি হওয়ায় এখানে যাতায়াত করাও সহজ। চাইলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ঘোরার পাশাপাশি আশপাশের আরও কিছু দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখতে পারেন। আজ আমরা জানবো সোহরাওয়ার্দী উদ্যান কোথায়, এর ইতিহাস, কী দেখবেন, কীভাবে যাবেন, প্রবেশ করতে কত টাকা লাগে, খোলার সময়, কখন গেলে ভালো এবং কত সময় হাতে রাখবেন।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যান কোথায় অবস্থিত?
সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার শাহবাগ এলাকায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলা একাডেমির কাছাকাছি অবস্থিত। উদ্যানটির আশপাশে রয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, দোয়েল চত্বর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এবং ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন।
শাহবাগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মেট্রোরেল স্টেশন থেকে সহজেই এখানে যাওয়া যায়। অবস্থানের কারণে ঢাকার অন্যান্য দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখার পরিকল্পনার সঙ্গেও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান যুক্ত করতে পারেন।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ইতিহাস
সোহরাওয়ার্দী উদ্যান একসময় রমনা রেসকোর্স ময়দান নামে পরিচিত ছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ঘটনার সঙ্গে এই স্থানটি জড়িয়ে আছে। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ এখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। একই বছরের ১৬ ডিসেম্বর এখানেই পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। স্বাধীনতার পর রমনা রেসকোর্স ময়দানের নাম পরিবর্তন করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান রাখা হয়।
এখানে দেখার কি কি আছে?
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঘুরতে গেলে ঐতিহাসিক স্থাপনা, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন এবং সবুজ পরিবেশ উপভোগ করতে পারবেন। এখানে উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থানগুলো হলো—
১. স্বাধীনতা স্তম্ভ
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ স্বাধীনতা স্তম্ভ। কাচের তৈরি উঁচু এই স্থাপনা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে স্মরণ করিয়ে দেয়। এর আশপাশের উন্মুক্ত চত্বরও ঘুরে দেখার মতো।
২. শিখা চিরন্তন
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্মত্যাগকারী শহীদদের স্মরণে নির্মিত হয়েছে শিখা চিরন্তন। এটি স্বাধীনতার চেতনা ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।
৩. স্বাধীনতা জাদুঘর
স্বাধীনতা স্তম্ভের নিচে ভূগর্ভে অবস্থিত স্বাধীনতা জাদুঘর। এখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ছবি, দলিল ও নিদর্শন প্রদর্শিত হয়। ইতিহাস সম্পর্কে জানতে চাইলে জাদুঘরটি ঘুরে দেখতে পারেন।
৪. ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের স্থান
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই মাঠেই তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন। স্থানটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
৫. পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক স্থান
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর এই মাঠেই পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করে। বাংলাদেশের বিজয়ের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই স্থানটি উদ্যানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন।
৬. সবুজ পরিবেশ ও খোলামেলা প্রাঙ্গণ
ঐতিহাসিক স্থাপনার পাশাপাশি উদ্যানের সবুজ গাছপালা, হাঁটার জায়গা ও খোলামেলা পরিবেশে কিছুটা সময় কাটাতে পারবেন। বিকেলে হাঁটাহাঁটি কিংবা অবসর সময় কাটানোর জন্য জায়গাটি বেশ উপযোগী।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যান কিভাবে যাবেন?
ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে
ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে বাস, রিকশা, সিএনজি বা রাইড শেয়ারিংয়ে শাহবাগ, টিএসসি, দোয়েল চত্বর কিংবা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন এলাকায় যেতে পারেন। এসব জায়গা থেকে হেঁটে বা রিকশায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের প্রবেশপথে পৌঁছানো যায়।
মেট্রোরেলে
মেট্রোরেলে গেলে শাহবাগ বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশনে নামতে পারেন। স্টেশন থেকে রিকশা কিংবা হেঁটে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যেতে পারবেন।
ঢাকার বাইরে থেকে
ঢাকার বাইরে থেকে বাস বা ট্রেনে প্রথমে ঢাকায় আসতে হবে। এরপর শাহবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা টিএসসি এলাকায় গিয়ে রিকশা, সিএনজি কিংবা হেঁটে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যেতে পারবেন।
প্রবেশ করতে কত টাকা লাগে?
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মূল প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে কোনো টিকিটের প্রয়োজন হয় না। অর্থাৎ এখানে বিনামূল্যে ঘুরে দেখতে পারবেন। তবে উদ্যানের ভেতরে অবস্থিত স্বাধীনতা জাদুঘরে প্রবেশের জন্য আলাদা টিকিট সংগ্রহ করতে হয়।
তবে, স্বাধীনতা জাদুঘরে বাংলাদেশি দর্শনার্থীদের প্রবেশমূল্য জনপ্রতি ২০ টাকা। বিদেশি দর্শনার্থীদের জন্য টিকিটের মূল্য আলাদা।
খোলার সময়
সোহরাওয়ার্দী উদ্যান সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত একটি পাবলিক পার্ক। তবে এর প্রবেশপথ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে প্রবেশের সময় পরিবর্তিত হতে পারে। তাই যাওয়ার আগে সর্বশেষ নির্দেশনা জেনে নেওয়া ভালো।
অন্যদিকে, উদ্যানের ভেতরে অবস্থিত স্বাধীনতা জাদুঘরের সময়সূচি আলাদা। যেমনঃ
– শনিবার থেকে বুধবার: সকাল ১০:৩০টা থেকে বিকেল ৪:৩০টা।
– বৃহস্পতিবার: সাপ্তাহিক বন্ধ।
– শুক্রবার: বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬:৩০টা।
বিশেষ ছুটি বা সরকারি নির্দেশনায় সময়সূচি পরিবর্তিত হতে পারে। তাই জাদুঘর দেখতে যাওয়ার আগে সময়সূচি যাচাই করে নিন।
কখন গেলে ভালো হবে?
সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ঘুরে দেখার জন্য বিকেলের সময়টি বেশ উপযোগী। এ সময় তুলনামূলক আরামদায়ক আবহাওয়ায় উদ্যানের সবুজ পরিবেশে হাঁটাহাঁটি ও সময় কাটানো যায়। ছবি তুলতে চাইলে বিকেলের নরম আলোও ভালো কাজে আসবে।
তবে ছুটির দিন ও বিকেলের দিকে দর্শনার্থীদের ভিড় বেশি হতে পারে। নিরিবিলি পরিবেশে ঘুরতে চাইলে কর্মদিবসে যাওয়ার চেষ্টা করুন। স্বাধীনতা জাদুঘর দেখতে চাইলে অবশ্যই জাদুঘরের নির্ধারিত খোলার সময় অনুযায়ী ভ্রমণের পরিকল্পনা করুন।
কত সময় হাতে রাখবেন?
শুধু সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সবুজ পরিবেশ ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো ঘুরে দেখতে প্রায় ১ থেকে ২ ঘণ্টা সময় হাতে রাখুন। তবে স্বাধীনতা জাদুঘরসহ পুরো এলাকা বিস্তারিতভাবে ঘুরে দেখতে চাইলে ২ থেকে ৩ ঘণ্টা সময় রাখলে ভালো হবে।
জাদুঘরের সময়সূচি অনুযায়ী ভ্রমণের পরিকল্পনা করলে তাড়াহুড়ো ছাড়াই সবকিছু দেখতে পারবেন।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যান সম্পর্কে সাধারণ প্রশ্ন
১. সোহরাওয়ার্দী উদ্যান কোথায় অবস্থিত?
সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ঢাকার শাহবাগ এলাকায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলা একাডেমির কাছাকাছি অবস্থিত।
২. সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রবেশ করতে কত টাকা লাগে?
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মূল প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে কোনো টাকা লাগে না। তবে স্বাধীনতা জাদুঘরে প্রবেশের জন্য আলাদা টিকিট প্রয়োজন।
৩. সোহরাওয়ার্দী উদ্যান কখন খোলা থাকে?
উদ্যানটি সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে। তবে প্রবেশের নির্দিষ্ট সময় নিরাপত্তা ও কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে।
৪. স্বাধীনতা জাদুঘর কি বৃহস্পতিবার বন্ধ থাকে?
হ্যাঁ, প্রকাশিত সময়সূচি অনুযায়ী স্বাধীনতা জাদুঘর প্রতি বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক ছুটির জন্য বন্ধ থাকে।
৫. সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের আগের নাম কী ছিল?
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের আগের নাম ছিল রমনা রেসকোর্স ময়দান।
৬. সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কী কী দেখার আছে?
এখানে স্বাধীনতা স্তম্ভ, শিখা চিরন্তন, স্বাধীনতা জাদুঘর, ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের স্থান এবং ১৯৭১ সালের আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক স্থান দেখতে পারবেন।
৭. মেট্রোরেলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যাওয়া যায় কি?
হ্যাঁ, মেট্রোরেলে শাহবাগ অথবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশনে নেমে হেঁটে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যেতে পারবেন।
৮. সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ঘুরতে কত সময় লাগে?
শুধু উদ্যান ঘুরে দেখতে ১ থেকে ২ ঘণ্টা এবং স্বাধীনতা জাদুঘরসহ বিস্তারিতভাবে দেখতে প্রায় ২ থেকে ৩ ঘণ্টা সময় রাখতে পারেন।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের আশপাশে দর্শনীয় স্থান
সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ঘোরার পাশাপাশি চাইলে ঢাকার আরও কয়েকটি পরিচিত দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখতে পারেন। এর আশপাশে রয়েছে—
- বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর
- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও টিএসসি
- বাংলা একাডেমি
- দোয়েল চত্বর
- রমনা পার্ক
একই দিনে এসব জায়গার কয়েকটি ঘুরে দেখার পরিকল্পনা করলে সময় বাঁচবে এবং ঢাকার ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ সম্পর্কে ভালো ধারণা পাওয়া যাবে।










