সন্ধ্যা নামলেই জমিদার বাড়িতে সন্ধাপূজা হতো। বিশালবাড়ি জুড়ে তখন ধুঁপের গন্ধে পরিপূর্ণ । সংস্কৃতমনা জমিদার পরিবারে প্রতি সন্ধ্যায় আড়ম্বরপূর্নভাবে বাজানো হতো ঢোলসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র । সাথে বসতো যাত্রাপালা, নাটক সহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আসর। জমিদার বাড়িটির নাম বালাপুরের জমিদার বাড়ি ( Balapur Jomidar Bari ) । নরসিংদীর বালাপুর গ্রামে অবস্থিত এটি।
এক নজরে বালাপুর জমিদার বাড়ি
অবস্থানঃ নরসিংদী সদর উপজেলার পাইকারচর ইউনিয়নের বালাপুর গ্রাম।
প্রতিষ্ঠাতাঃ জমিদার নবীনচন্দ্র সাহা।
ঐতিহাসিক স্থাপনাঃ একতলা, দোতলা ও তিনতলা ভবনসহ একটি জমিদারবাড়ি কমপ্লেক্স।
যাতায়াতঃ ঢাকা থেকে মাধবদী হয়ে স্থানীয় যানবাহনে যাওয়া যায়।
ভ্রমণের সময়ঃ দিনের আলো থাকতে ঘুরে দেখা ভালো। এটি সাধারণত একদিনের ভ্রমণের উপযোগী।
বালাপুর জমিদার বাড়ির ইতিহাস
১৯৪৭ সালে বাংলা তখন দুইভাগ হয়ে গেলো। বহু হিন্দু পরিবার বাধ্য হয়েছিলো পূর্ব বাংলা ত্যাগ করতে। ঠিক তেমনি বালাপুরের জমিদার বাড়ির লোকজনকেও ছাড়তে হয়েছিলো এই দেশ। যাওয়ার সময় তারা জমিজমা সহ বাড়িটি মন্দিরের নামে উইল করে দিয়ে যায়। বাড়িটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন জমিদার নবীনচন্দ্র সাহা। কিন্তু কার নামে বাড়িটির নামকরণ করা হয়েছে তা জানা যায়নি।
৩২০ বিঘা জমির উপর তৈরী বাড়িতে একটি একতলা ভবন, দুইটি দুই তলা ভবন এবং একটি তিন তলা ভবন রয়েছে। সেখানে ৩১ কক্ষ বিশিষ্ট একটি দালান শুধুমাত্র অতিথীদের জন্য তৈরী। বাড়িটিতে কক্ষ রয়েছে মোট ১০৩ টি। বাড়িটির প্রতিটি কক্ষ মোজাইক করা এবং দরজাগুলো ফুলপাতার নকশা করা। বাড়িটির পশ্চিম দিকে একটি বিশাল বড় গেট আছে।
তাছাড়া পাশেই রয়েছে ৯২ শতক জমি জুড়ে একটি পুকুর, শানবাঁধানো ঘাট, মন্দির এবং জমিদারী দূর্গামন্ডপ।
আরো রয়েছে ১০০ বছরের পুরানো বালাপুর নবীন চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়। এই ঐতিহ্যবাহী বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯১৯ সালে।
প্রায় শতবছর আগে একা হয়ে যাওয়া বাড়িটি এখন পরিত্যাক্ত। লতাপাতায় ঢেকে গেছে। আপনি যদি বর্তমান যান্ত্রিক জীবনে বিরক্ত হয়ে পরেন, তবে কিছু সময়ের জন্য চলে যেতে পারেন বালাপুরের জমিদার বাড়িতে । তাহলে কিছুটা সময় কাটবে মনোমুগ্ধকর প্রাচীন ঐতিহ্যর কাছে।
জমিদার বাড়িটির ভিডিও দেখুনঃ বালাপুর জমিদার বাড়ি
বালাপুর জমিদার বাড়ি কোথায় অবস্থিত?
বালাপুরের জমিদার বাড়িটি নরসিংদীর পাইকারচর ইউনিয়নে অবস্থিত। যা ঢাকা শহর থেকে খুব কাছে। একদিনেই ঢাকা থেকে গিয়ে জমিদার বাড়িটি ঘুরে আসা সম্ভব।
বালাপুর জমিদার বাড়ির স্থাপত্য ও দর্শনীয় বিষয়
বালাপুর জমিদার বাড়ির অন্যতম আকর্ষণ এর পুরোনো ভবনগুলোর স্থাপত্যশৈলী। ভবনের বিভিন্ন অংশে ফুল-লতাপাতার নকশা করা দরজা-জানালা, অলংকরণ এবং মোজাইক করা মেঝের বিবরণ পাওয়া যায়। বিশাল প্রবেশদ্বার ও একাধিক তলা নিয়ে গঠিত ভবনগুলো জমিদারি আমলের স্থাপত্যরীতির পরিচয় বহন করে।
জমিদারবাড়ির সঙ্গে একটি পুকুর, ঘাট, মন্দির এবং দুর্গাপূজার মণ্ডপের উল্লেখ রয়েছে। এসব স্থাপনা একসময়ের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের ধারণা দেয়। তবে বর্তমানে কোন স্থাপনা কতটা অক্ষত রয়েছে, তা ভ্রমণের আগে সাম্প্রতিক তথ্য বা সরেজমিন পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া ভালো।
ঢাকা থেকে বালাপুর জমিদার বাড়ি যাওয়ার উপায়
ঢাকা থেকে কিভাবে আসবেন
ঢাকা থেকে গন্তব্য স্থানে যেতে প্রথমে আপনি গুলিস্থানের সার্জেন্ট আহাদ পুলিশ বক্সের সামনে থেকে নরসিংদীর মাধবদী যাবেন মেঘালয় বা লোকাল বাসে করে। অথবা সিলেটগামী যেকোন লোকাল বাসে করেও যেতে পারবেন।
ভাড়া পরবে জনপ্রতি ১৫০ টাকা থেকে ১৮০ টাকা। এরপর মাধবদী বাস স্ট্যান্ড থেকে রিকশা ভাড়া করে জমিদার বাড়ি চলে যেতে পারেন। তবে এইভাবে গেলে ভাড়া বেশি পড়বে। আর সিএনজিতে যেতে চাইলে মাধবদী বাস স্ট্যান্ড থেকে প্রথমে রিকশা নিয়ে চলে যাবেন গরুরহাট সিএনজি স্টেশন। সেখান থেকে জনপ্রতি ৪০-৫০ টাকা ভাড়ায় সিএনজি আপনাকে নবীন চন্দ্র উচ বিদ্যালয়ের সামনে নামিয়ে দিবে। এরপর সামান্য হাঁটলেই সামনে পেয়ে যাবেন কাঙ্খিত জমিদার বাড়িটি।
চট্টগ্রাম থেকে যেভাবে যাবেন
চট্টগ্রাম থেকে সরাসরি নরসিংদী যাওয়ার সড়কপথে তেমন ভালো ব্যবস্থা নেই। তাই প্রথমে এস. আলম, সৌদিয়া, গ্রিন লাইন, সোহাগ ইত্যাদি ঢাকাগামী বাস দিয়ে কাঁচপুর আসবেন। ভাড়া পরবে ৫৫০ টাকা থেকে ১৫০০ টাকা (এসি নন এসি) । এরপর কাঁচপুর থেকে ঢাকা সিলেট রোড হয়ে বাসে নরসিংদীর মাধবদী যাবেন। এরপর রিকশা নিয়ে গরুরহাট বাস স্ট্যান্ড। সেখান থেকে সিএনজি বা রিকশায় করে বালাপুর জমিদার বাড়ি। তাছাড়া ইচ্ছে করলে রেলপথে মহানগর এক্সপ্রেস,কর্ণফুলী,চট্টলা এক্সপ্রেস এবং মেইল ট্রেন দিয়ে নরসিংদী যাওয়া যায় সরাসরি চট্টগ্রাম থেকে। এরপর রেল স্টেশন থেকে লোকাল বাস বা সিএনজি করে মাধবদী গিয়ে সেখান থেকে বালাপুর জমিদার বাড়ি।
সিলেট থেকে যেভাবে যাবেন
সিলেট থেকে যেতে হলে প্রথমে সিলেটের কদমতলী থেকে নরসিংদীগামী যেকোনো বাসে করে মাধবদী বাস স্ট্যান্ডে আসবেন। ভাড়া পড়বে ৩৫০-৮০০ টাকা। তারপর রিকশা নিয়ে গরুরহাট সিএনজি স্ট্যান্ড হয়ে লোকাল সিএনজি করে ২০-৩০টাকা ভাড়ায় বালাপুর জমিদার বাড়ি।
থাকবেন কোথায়
বালাপুর জমিদার বাড়ি মূলত একদিনের ভ্রমণ স্থান। যদি অতিরিক্ত প্রয়োজনে আশেপাশে রাত কাটাতে হয় তবে চলে যেতে হবে মাধবদী। সেখানে কোনো আবাসিক হোটেলে থাকতে হবে। কয়েকটি আবাসিক হোটেলের নাম ও যোগাযোগের নম্বর উল্লেখ করে দিচ্ছি যেখানে ৪০০-১০০০ টাকার মধ্যে রুম পাবেন। হোটেল সৈকত বডিং,হোটেল ওয়েস্টিন ইন্টারন্যাশনাল আবাসিক(01718-174382)। এছাড়া হেরিটেজ রিসোর্ট নামে একটি রিসোর্টও রয়েছে মাধবদীতে। 01755-677149 হেরিটেজ রিসোর্টে যোগাযোগের নম্বর।
খাবেন কোথায়
খাবারের ব্যাপারে আপনাকে মাধবদীতেই খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। এইখানে কিছু খাবারের হোটেল রয়েছে যেখানে আপনি মোটামুটি স্বল্পমূল্যে মাছ, মাংস অথবা বিরিয়ানি দিয়ে খাবারের বন্দোবস্ত করতে পারবেন।
বালাপুর জমিদার বাড়ি ভ্রমণের আগে যা জানা দরকার
- বালাপুর জমিদার বাড়ি দেখতে যাওয়ার পরিকল্পনা করলে দিনের আলো থাকতে পৌঁছানোর চেষ্টা করুন।
- পুরোনো ভবনের কোনো অংশ দুর্বল বা ঝুঁকিপূর্ণ হলে সেখানে প্রবেশ করবেন না।
- স্থানটি ব্যক্তিমালিকানাধীন, ধর্মীয় বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি ও নির্দেশনা মেনে চলুন।
- ভ্রমণের আগে মাধবদী থেকে স্থানীয় যানবাহনের বর্তমান ভাড়া জেনে নিন।
- সঙ্গে পর্যাপ্ত পানীয় জল রাখুন এবং আবর্জনা নির্ধারিত স্থানে ফেলুন।
- পুরোনো স্থাপনার ইট, দরজা, নকশা বা অন্য কোনো অংশ স্পর্শ করে ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকুন। এতে ঐতিহাসিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে সহায়তা হবে।
বালাপুর জমিদার বাড়ি সম্পর্কে কিছু সাধারণ প্রশ্ন
১. বালাপুর জমিদার বাড়ি কোথায়?
বালাপুর জমিদার বাড়ি নরসিংদী সদর উপজেলার পাইকারচর ইউনিয়নের বালাপুর গ্রামে অবস্থিত।
২. বালাপুর জমিদার বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা কে?
জমিদার নবীনচন্দ্র সাহাকে বালাপুর জমিদার বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
৩. ঢাকা থেকে বালাপুর জমিদার বাড়ি কীভাবে যাবেন?
ঢাকা থেকে মাধবদীগামী বাসে মাধবদী পৌঁছে সেখান থেকে স্থানীয় সিএনজি বা রিকশায় বালাপুর জমিদার বাড়ির দিকে যেতে পারেন। যাত্রার আগে স্থানীয় রুট ও ভাড়া যাচাই করে নিন।
৪. বালাপুর জমিদার বাড়িতে কী কী দেখা যায়?
ঐতিহাসিক ভবন, পুরোনো স্থাপত্যের অলংকরণ, পুকুর, ঘাট এবং ধর্মীয় স্থাপনার উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে বর্তমান অবস্থা সরেজমিনে যাচাই করা উচিত।
৫. বালাপুর জমিদার বাড়ি ঘুরে আসতে কত সময় লাগে?
সাধারণত কয়েক ঘণ্টার মধ্যে স্থানটি ঘুরে দেখা সম্ভব হতে পারে। তবে ভবনের প্রবেশাধিকার, বর্তমান অবস্থা এবং আশপাশের স্থান ঘুরে দেখার পরিকল্পনা অনুযায়ী সময় পরিবর্তিত হবে।
৬. বালাপুর জমিদার বাড়ি ভ্রমণে কত খরচ হয়?
খরচ নির্ভর করে যাতায়াতের মাধ্যম, বর্তমান পরিবহন ভাড়া, খাবার এবং ব্যক্তিগত খরচের ওপর। যাচাই করা বর্তমান ভাড়া ছাড়া নির্দিষ্ট মোট খরচ উল্লেখ করা ঠিক হবে না।
কাছাকাছি অন্যান্য দর্শনীয় স্থান
- লক্ষণ সাহার জমিদার বাড়ি
- ড্রিম হলিডে পার্ক
- গিরিশ চন্দ্র সেনের বাড়ি
- মেঘনা নদীর পাড়
- আটকান্দি মসজিদ
- পারুলিয়া মসজিদ
- সোনাইমুড়ি টেক
- আটকান্দি মসজিদ
- উয়ারী বটেশ্বর
- বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান জাদুঘর
- শাহ ইরানী মাজার
- দেওয়ান শরীফ মসজিদ
- আশ্রাবপুর মসজিদ
- বেলাব বাজার জামে মসজিদ











আপনাদের এত সুন্দর বর্ননা শুনে দেখতে গিয়েছিলাম বালাপুরের জমিদার বাড়ি।
ভাগ্যিস কাছেই ছিলাম বলে, যে আফসোস হয়েছে, দুর হতে এটা দেখতে আসলে নিজের চুল নিজে ছিড়তাম।
আল্লাহর ওয়াস্তে এই প্লেসটা ডিলিট করেন।
এলাকার মানুষরাই আমাদের দেখছে, আমরা কী দেখতে আসছি!!
আসলে এটি একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা। শত বছরের পুরনো জিনিস দেখতে এমনই লাগবে। মনে হবে টাকা সময় দুটোই নষ্ট হল। আসলে একখানে দেখার বিষয়ের চাইতে সেই সময়ের ঘটনাপ্রবাহ অনুধাবন করাটাই মুখ্য হওয়া উচিত ছিল। হয়ত আপনাদের সেটি উদ্দেশ্য ছিল না। আমাদের পুরনো ইতিহাস ঐতিহ্য তোলে ধরাই আমাদের মুল কাজ।